ক্যালিফোর্নিয়ার অরেঞ্জ কাউন্টির ফুলারটনে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় অস্ত্রধারী এক ব্যক্তির সন্ধানে পুলিশ ও ফেডারেল এজেন্টরা অভিযান চালালেও স্কুল কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবকদের আগাম কোনো সতর্কতা না দেওয়ায় তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক আইসিই অভিযান ও দেশজুড়ে স্কুলে গুলির ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
গত সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ভোরে ফুলারটন পুলিশ একটি আতঙ্কজনক ফোনকল পায়। ফোনদাতারা জানান, সাদা শার্ট পরা এক ব্যক্তি হাইল্যান্ড পাইনট্রি অ্যাপার্টমেন্ট হোমস এলাকায় বেড়া টপকে পালাচ্ছেন এবং তার হাতে একটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। সকাল ৬টা ৪৬ মিনিটে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তখন দেখা যায়, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE), এফবিআই ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশন্সের এজেন্টরাও ওই ব্যক্তির খোঁজে এলাকায় উপস্থিত।
পরবর্তী এক ঘণ্টার অনুসন্ধান ঘিরেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফেডারেল অভিবাসন এজেন্টদের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে ঢোকার জন্য পুলিশ গেট খুলে দিয়েছিল। তবে ফুলারটন পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, আইসিই নিজেই গেটের তালা কেটে প্রবেশ করেছে।
এই সময়েই কাছের উডক্রেস্ট এলিমেন্টারি স্কুলে শুরু হচ্ছিল আরেকটি স্বাভাবিক স্কুলদিন। সকাল ৭টায় শিক্ষার্থীরা স্কুলের আগাম কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসতে শুরু করে—অর্থাৎ অস্ত্রধারী সন্দেহভাজনের খোঁজ চলার প্রায় ২০ মিনিট পরই শিশুদের আগমন শুরু হয়।
ফুলারটন স্কুল ডিস্ট্রিক্টের মানবসম্পদ বিভাগের উপ-সুপারিনটেনডেন্ট চ্যাড হ্যামিট জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রথম জানতে পারেন স্কুলের কাছে অভিবাসন এজেন্টদের উপস্থিতির কথা। সকাল ৭টা ১৪ মিনিটে তিনি পুলিশে ফোন করে জানতে চান কী ঘটছে। প্রায় ৩০ মিনিট পর পুলিশ তার ফোন ফেরত দেয়।
হ্যামিট বলেন, “তারা আমাকে জানায়, একজন সন্দেহভাজন পালিয়ে বেড়াচ্ছে এবং পুলিশ এলাকায় ঘেরাও দিয়েছে। কিন্তু তারা বলেনি যে সে অস্ত্রধারী। আমরা যদি জানতাম, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে স্কুল লকডাউন করা হতো।”
তিনি বলেন, এ সময়ও শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দেওয়া চলছিল এবং তিনি, স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি নজরে রাখছিলেন। সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ফুলারটন পুলিশ ইনস্টাগ্রামে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ার পরই শিক্ষক, অভিভাবক ও কর্মীরা জানতে পারেন যে সন্দেহভাজন ব্যক্তি সশস্ত্র ছিল।
ফুলারটনের অভিভাবক ও ইউএসসি-র সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোডি ভালেহো প্রশ্ন তোলেন, “স্কুল ডিস্ট্রিক্টকে কেন জানানো হয়নি যে কাছাকাছি একজন বন্দুকধারী আছে? অভিভাবকদের কেন সতর্ক করা হয়নি? শিশুরা স্কুলে হাঁটছিল, অথচ কেউই জানত না এত বড় ঝুঁকির কথা।”
ফুলারটন পুলিশপ্রধান জন রাডুস বলেন, তাদের কমিউনিটি রিসোর্স অফিসার তখনকার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী স্কুল ডিস্ট্রিক্টকে অবহিত করেছিলেন।
“আমরা যোগাযোগ রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কিন্তু ওই ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কাছে তথ্য খুবই সীমিত ছিল,” রাডুস বলেন। “যদি অফিসার জানতেন যে সে সশস্ত্র, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই স্কুলকে জানাতেন।”
স্কুলে তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিভাবক লরা ম্যানচেস্টার বলেন, একজন শিক্ষক তাকে ফোন করে জানান যে শিক্ষকরা আতঙ্কে দৌড়াচ্ছেন, ক্লাস থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কাউন্সেলর আনা হয়েছে।
“স্টাফরা কাঁদছিলেন। এমন পরিস্থিতি খুব বড় বিষয়,” বলেন তিনি।
হ্যামিট নিশ্চিত করেন যে শিক্ষক-কর্মীরা ‘মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’ ছিলেন এবং অভিভাবকরা জবাব চাইছিলেন।
“অভিভাবকরা জিজ্ঞেস করছিলেন—কেন স্কুল লকডাউন করা হয়নি?” তিনি বলেন। “আমাদের মূল চাওয়া ছিল তথ্য। আমরা শিশুদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফেলতে পারি না।”
এদিকে, হাইল্যান্ড পাইনট্রি অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারা পুলিশ ও অভিবাসন এজেন্টদের একসঙ্গে চলাফেরার ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেন। এতে সন্দেহ তৈরি হয় যে ফুলারটন পুলিশ আইসিইকে সহায়তা করেছে। ‘কনসার্নড প্যারেন্টস অব ফুলারটন’ নামের একটি গোষ্ঠী স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ তোলে।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, “যা দেখা গেছে, তা স্পষ্টভাবেই ফুলারটন পুলিশ আইসিইকে সহায়তা করছে—সম্ভবত ক্যালিফোর্নিয়া আইন লঙ্ঘন করে—এবং একই সঙ্গে একটি সশস্ত্র ব্যক্তির হাত থেকে শিশু ও এলাকাকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।”
তবে ফুলারটন পুলিশ বিভাগ দাবি করছে, তারা অভিবাসন আইন প্রয়োগে অংশ নেয় না। রাডুস বলেন, “এটি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য খুবই খারাপ পরিস্থিতি ছিল। আমরা চাই না কেউ ভাবুক আমরা আইসিইর হয়ে কাজ করছি। আমাদের সেদিনের উপস্থিতির একমাত্র কারণ ছিল জননিরাপত্তা।”
তিনি আরও বলেন, অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের গেটের তালা আইসিই এজেন্টরাই কেটেছিল, পুলিশ নয়। যদিও বাসিন্দারা ভিন্ন দাবি করছেন।
বাসিন্দা ড্যানিয়েলা ভাসকেস বলেন, সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে তিনি সেখানে পৌঁছে দেখেন গেট খোলা, বাইরে অচিহ্নিত গাড়ি ও ভেতরে সবুজ ভেস্ট পরা লোকজন।
“তখন তালা অক্ষত ছিল,” তিনি বলেন।
ভাসকেস জানান, তিনি এজেন্টদের বন্দুক হাতে ঢুকতে দেখে দূর থেকে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। তার ভিডিওতে দেখা যায়, এজেন্টরা পার্কিং লট তল্লাশি করছেন এবং বাসিন্দাদের চিৎকারের জবাবে হাতে হৃদয়ের চিহ্ন দেখাচ্ছেন।
বাসিন্দারা চিৎকার করে বলেন, “আপনারা আমাদের কমিউনিটিকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছেন, আমাদের শিশুদের ভয় দেখাচ্ছেন।”
আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, এক নিরস্ত্র প্রতিবেশী চিৎকার করার সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা বন্দুকের ওপর হাত রাখছেন এবং পাশে আরেক কর্মকর্তা রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
ভাসকেসের দাবি, “এজেন্টদের বের করে দেওয়ার সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনাকে বলছিলেন, ‘এখন গেট আবার তালা দিতে পারেন।’”
অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ গেটের তালা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
ক্যালিফোর্নিয়া ভ্যালুজ অ্যাক্ট (সেনেট বিল ৫৪) অনুযায়ী, স্থানীয় পুলিশকে ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে অংশ নিতে নিষেধ করা হয়েছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া।
শেষ পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা অনুসন্ধানের পরও অস্ত্রধারী সন্দেহভাজনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটিকে এলাকাবাসী ‘মানসিকভাবে আঘাতমূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
“আমরা সুরক্ষিত বোধ করতে চাই,” বলেন লরা ম্যানচেস্টার। “সেদিন আমরা সেটা অনুভব করিনি।”
এই ঘটনাটি ফুলারটনের স্কুল নিরাপত্তা, পুলিশি সমন্বয় ও অভিবাসন অভিযানের প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম