রেকর্ডে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের পুরো ক্যালিফোর্নিয়াজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর গ্যাভিন নিউসম। সম্ভাব্য শীতকালীন ঝড় ও এর প্রভাব মোকাবিলায় আগেভাগেই রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গভর্নরের কার্যালয় জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে রাজ্যের সম্পদ ও জরুরি প্রস্তুতি কার্যক্রম সক্রিয় করা হচ্ছে। এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। তাই বন্যা, ভূমিধস ও উপকূলীয় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জরুরি অবস্থার ঘোষণার ফলে রাজ্যের বিভিন্ন সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি সরঞ্জাম মজুতের কাজ শুরু করতে পারবে। বন্যা মোকাবিলায় বালুর বস্তা ও পানি নিষ্কাশনের পাম্পসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও বিভিন্ন এলাকায় আগাম পৌঁছে দেওয়া হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার পরিবহন বিভাগ ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে যান নিয়ন্ত্রণ, সড়ক বন্ধ করা এবং তুষার সরানোর সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখবে। প্রয়োজনে ক্যালিফোর্নিয়া ন্যাশনাল গার্ডকে বন্যা মোকাবিলা, উদ্ধার অভিযান, প্রকৌশল ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার জরুরি সেবা বিভাগের পরিচালক ক্যারোলিন থমাস জ্যাকবস বলেন, ঝড় ও দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে না। এল নিনোর আগেই জনবল, সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রস্তুত রাখার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দা ও জরুরি সেবাকর্মীদের দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম করার চেষ্টা চলছে।
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ু ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের একটি ধরণ। স্বাভাবিক অবস্থায় বিষুবরেখা বরাবর বাণিজ্যিক বায়ু পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে উষ্ণ পানি এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে সমুদ্রের গভীর থেকে ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি উপরে উঠে আসে।
এল নিনোর সময় এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে যায় এবং উষ্ণ পানি আবার যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের দিকে ফিরে আসে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহের পরিবর্তন ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে ভিন্ন ধরনের আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চল ও কানাডার কিছু এলাকায় তুলনামূলক শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত এবং বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এর প্রভাব সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়ে। এল নিনোর কারণে সমুদ্রের গভীর থেকে ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি উপরে ওঠার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়। এতে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ কমতে পারে, যার প্রভাব পড়ে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটননির্ভর মাছ এবং পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর।
এর বিপরীত জলবায়ু ধরণ হলো লা নিনা। এ সময় বাণিজ্যিক বায়ুপ্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে শক্তিশালী হয় এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম দিকে আরও বেশি উষ্ণ পানি সরে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে গভীর সমুদ্র থেকে ঠান্ডা পানি ওপরে ওঠার প্রবণতা বাড়ে।
লা নিনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে খরা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও কানাডায় ভারী বৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সাধারণত এল নিনো ও লা নিনার একটি পর্ব নয় থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও দীর্ঘ সময়, এমনকি কয়েক বছরও স্থায়ী হতে পারে।
সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো ও লা নিনার মতো পরিস্থিতি দেখা গেলেও এর নির্দিষ্ট কোনো নিয়মিত সময়সূচি নেই। এবারের সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় তাই ক্যালিফোর্নিয়া আগেভাগেই জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করছে।