যুক্তরাজ্যের কেন্টে চলতি বছরের মার্চে মেনিনজাইটিস বি-এর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পেছনে থাকা ব্যাকটেরিয়া কেন এত দ্রুত ছড়িয়েছিল এবং আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থতা তৈরি করেছিল, তার কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের মতে, ব্যাকটেরিয়াটি মানুষের গলায় স্বাভাবিকভাবে থাকা অন্য কিছু জীবাণু থেকে জেনেটিক উপাদান সংগ্রহ করে নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল।
কেন্টের ওই প্রাদুর্ভাবে ২০ জনের বেশি তরুণ আক্রান্ত হন, যাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। তাদের সবাইকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। আক্রান্তদের মধ্যে নয়জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখতে হয়েছিল এবং দুজন মারা যান। প্রাদুর্ভাবটির সঙ্গে ক্যান্টারবারির একটি নাইটক্লাবের যোগসূত্র পাওয়া যায়।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, এটি অন্য কিছু জীবাণুর কাছ থেকে জেনেটিক উপাদান গ্রহণ করেছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এই জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়াটির একটি নতুন ধরন তৈরি হয়, যা নাইটক্লাবে থাকা তরুণদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং গুরুতর অসুস্থতা তৈরি করে।
গবেষকেরা বলছেন, এ ধরনের জেনেটিক পরিবর্তনকে ‘হরাইজন্টাল জিন ট্রান্সফার’ বলা হয়। ব্যাকটেরিয়া এভাবে নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে, যার ফলে সংক্রমণ আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা আগে এই ধরনের জীবাণুর মুখোমুখি না হওয়ায় সেটিকে শনাক্ত করতে বা প্রতিরোধ করতে দেরি করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থার রোগজীবাণু জিনোম বিশ্লেষণ বিশেষজ্ঞ ডা. শার্লিন রদ্রিগেস বলেন, এই গবেষণা দেখিয়েছে ব্যাকটেরিয়া কত দ্রুত এবং নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। তার মতে, তরুণদের মধ্যে ব্যাকটেরিয়াটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ঘনিষ্ঠ সামাজিক মেলামেশার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা বিরল এবং আগে থেকে অনুমান করা কঠিন হলেও ভবিষ্যতে আবারও ঘটতে পারে। তাই এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
কেন্টের প্রাদুর্ভাবের গতি ও ভয়াবহতা ছিল অস্বাভাবিক। অল্প সময়ের মধ্যে একই এলাকায় এত বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ায় তখন ঘটনাটিকে নজিরবিহীন ও বিস্ফোরণাত্মক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়, আক্রান্ত একজন ব্যক্তি নাইটক্লাবে সংক্রমণটি নিয়ে আসার পর সেদিন রাতে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে।
মেনিনজাইটিস ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। চুম্বন, একই পানীয়ের বোতল ব্যবহার কিংবা ভ্যাপ ভাগাভাগি করার মতো আচরণেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, যে জেনেটিক পরিবর্তন ব্যাকটেরিয়াটিকে এতটা বিপজ্জনক করে তুলেছিল, সেটিই আবার প্রাদুর্ভাবটি দ্রুত থেমে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত এত বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে তারা অজান্তে সংক্রমণ ছড়ানোর মতো নীরব বাহক হিসেবে দীর্ঘ সময় থাকতে পারেননি।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রবার্ট হেইডারম্যানের মতে, প্রাদুর্ভাবের আগে কিছু সুস্থ মানুষ হয়তো কিছু সময়ের জন্য এই ব্যাকটেরিয়া বহন করছিলেন। পরে নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সংক্রমণটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কেন্টের ঘটনার পর চলতি শরতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া তরুণদের সুরক্ষায় মেনিনজাইটিস বি টিকার একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। দুই ডোজ টিকা সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৫ বছর বয়সে নিয়মিত মেনিনজাইটিস বি টিকা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে সরকারের প্রতি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে এমন এই রোগ থেকে তরুণদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
মেনিনজাইটিস বা সেপসিসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জ্বর, মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, আলো সহ্য করতে না পারা, চাপ দিলে মিলিয়ে না যাওয়া ত্বকের ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট ও পেশিতে ব্যথা—এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।