আমেরিকা

ট্রাম্পের ২৫০ ফুট বিজয়স্তম্ভ নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিলেন মার্কিন বিচারক

ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিশাল বিজয়স্তম্ভ নির্মাণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন ফেডারেল আদালত। বৃহস্পতিবার এক আদেশে নির্মাণকাজ শুরুর আগে ১৪ দিনের বিরতি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন জেলা বিচারক তানিয়া চুটকান। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছিল, চলতি সপ্তাহেই প্রকল্পটির কাজ শুরু হতে পারে। আদালতের এই নির্দেশের কয়েক ঘণ্টা আগেই ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশন (এনসিপিসি) ২৫০ ফুট বা প্রায় ৭২ মিটার উঁচু স্থাপনাটি নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল। কমিশনের ভোটে ৮ জন পক্ষে এবং ৪ জন বিপক্ষে মত দেন। কমিশনের ট্রাম্প-মনোনীত সদস্যদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যদের সম্মানে এই স্থাপনাটি উপযুক্ত স্মারক হবে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, বিশাল এই স্থাপনা আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের দৃশ্য আড়াল করবে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার সেনাসদস্য ও সামরিক কর্মীর সমাধি রয়েছে। প্রস্তাবিত স্থাপনাটিকে অনেকে ‘আর্ক দ্য ট্রাম্প’ নামে অভিহিত করছেন। ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত বিখ্যাত বিজয়তোরণ ‘আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফ’-এর নামের সঙ্গে মিল রেখে এই নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীকে নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন রূপ দেওয়ার অংশ হিসেবে প্রকল্পটি হাতে নিয়েছেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রায় ৯ ঘণ্টার গণশুনানি ও জনমত গ্রহণের পর কমিশন নির্মাণের অনুমোদন দেয়। তবে প্রকল্পটি বন্ধের দাবিতে একাধিক মামলা হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কবে নির্মাণকাজ শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত নকশায় দেখা যায়, বিজয়স্তম্ভের শীর্ষে থাকবে সোনালি ডানাযুক্ত লেডি লিবার্টির ভাস্কর্য। এর দুই পাশে থাকবে দুটি সোনালি ঈগল। স্থাপনাটির দুই পাশে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে ‘ওয়ান নেশন আন্ডার গড’ এবং ‘লিবার্টি অ্যান্ড জাস্টিস ফর অল’। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, স্থাপনাটি শুধু স্মৃতিসৌধ হিসেবেই ব্যবহৃত হবে না, সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে সেখানে। প্রয়োজনে সেখান থেকে স্নাইপার ও ড্রোন মোতায়েনের সুবিধাও রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে। এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছিলেন, বিশ্বে এমন স্থাপনা আর কোথাও থাকবে না। তাঁর দাবি, বিশ্বের ৫৯টি প্রধান শহর ও রাজধানীর মধ্যে ওয়াশিংটনই একমাত্র শহর, যেখানে কোনো বিজয়তোরণ নেই। তবে কোন ৫৯টি শহরের কথা তিনি বলেছেন, তা নির্দিষ্ট করেননি। ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যান এবং ট্রাম্পের মনোনীত সদস্য মার্ক পাওলেটা বৃহস্পতিবারের বৈঠকে বলেন, জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে নিজেদের ইতিহাস ও পরিচয় বড় স্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ—এ বিষয়টি প্রেসিডেন্ট বুঝতে পেরেছেন। পাওলেটা ও অন্য কয়েকজন কমিশনারের মতে, কলাম্বিয়া আইল্যান্ডে একটি বিশাল স্মারক নির্মাণের পরিকল্পনা প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো। কংগ্রেস ও বিভিন্ন কমিশনও অতীতে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল। পাওলেটা আরও বলেন, এই বিজয়স্তম্ভ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সম্মান জানাবে। একই সঙ্গে আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের জন্য এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করবে। তবে প্রকল্পটির বিরোধিতা করছেন সাবেক সেনাসদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে ২৯ বছর দায়িত্ব পালন করা অ্যান রাইট পরে কূটনৈতিক দায়িত্বেও কাজ করেছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, নির্মাণকাজ বন্ধ করতে তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। রাইট বলেন, ‘আমরা বুলডোজারের সামনে নিজেদের বেঁধে রাখব। আমাদের মধ্যে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা সাবেক সেনাসদস্যও রয়েছেন। প্রয়োজনে তাঁদের হুইলচেয়ারও নির্মাণযন্ত্রের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হবে।’ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রসঙ্গ টেনে রাইট বলেন, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি ও ব্যক্তিগত অহংকারনির্ভর রাজনীতি ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আরেক সাবেক সেনাসদস্য জন পোমেরয়ও এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেছেন। তিনি ছয় বছর বিমানবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও সামরিক বাহিনীতে ছিলেন। তাঁর বাবা-মায়ের সমাধিও আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রে রয়েছে। পোমেরয়ের মতে, বিজয়স্তম্ভটি নির্মিত হলে সমাধিক্ষেত্রে আসা মানুষের জন্য জায়গাটির গাম্ভীর্য ও শোকাবহ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্থাপনাটিতে সামরিক সরঞ্জাম রাখার পরিকল্পনাকে তিনি অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, এ ধরনের স্থাপনা সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। রাইটের মতো পোমেরয়ও জানিয়েছেন, নির্মাণকর্মীরা কাজ শুরু করতে এলে তিনি তাঁদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এদিকে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জ্যারেড হাফম্যান কমিশনের কাছে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, এই স্থাপনা শুধু আর্লিংটন নয়, লিংকন মেমোরিয়ালের দৃশ্যও বাধাগ্রস্ত করবে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্য ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যপট বিশাল স্থাপনার কারণে ভেঙে যাবে। হাফম্যান আরও বলেন, ইতিহাসে সম্রাট ও রাজারা নিজেদের স্মরণীয় করে রাখতে বড় বড় বিজয়তোরণ নির্মাণ করতেন। তাঁর অভিযোগ, প্রস্তাবিত স্থাপনাটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের স্মারক। প্রকল্পটির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোতে পরিবেশের ক্ষতি, যানজট এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। স্থাপনাটি নির্মাণে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত একাধিক নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্প ইতিমধ্যে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হোয়াইট হাউসে নতুন বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনাও আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ কোটি ডলার। এ ছাড়া ১০৬ বছরের পুরোনো একটি গলফ কোর্স সংস্কারের পরিকল্পনাও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ট্রাম্প জায়গাটিকে ‘ট্র্যাশ আইল্যান্ড’ নামে অভিহিত করেছেন। সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নগর পরিকল্পনায় ট্রাম্পের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আরও বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন আদালতের আদেশের ফলে প্রস্তাবিত বিজয়স্তম্ভের নির্মাণকাজ আপাতত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।