লস এঞ্জেলেস

সমুদ্রগর্ভে হারানোর ঝুঁকিতে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার রেলপথ, রক্ষায় বড় উদ্যোগ

সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার ও উপকূলীয় ভাঙনে ধীরে ধীরে বিপন্ন হয়ে পড়ছে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ। বিশেষ করে সান ক্লেমেন্ট উপকূলের কয়েকটি স্থানে রেললাইন এতটাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে যে যেকোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই রেলপথ রক্ষায় এবার প্রায় ৭ লাখ ঘনগজ বালু ফেলার পাশাপাশি সমুদ্রতীর সুরক্ষায় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার ক্যালিফোর্নিয়া কোস্টাল কমিশন প্রকল্পটির জন্য বিস্তৃত অনুমোদন দিয়েছে। এর আওতায় সান ক্লেমেন্টের সংকুচিত হয়ে যাওয়া কিংবা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া সৈকতের বিভিন্ন অংশে প্রায় ৭ লাখ ঘনগজ বালু ফেলা হবে। অরেঞ্জ কাউন্টির কর্মকর্তাদের মতে, গত ৬০ বছরেরও বেশি সময়ে এই উপকূলীয় এলাকায় এটিই সবচেয়ে বড় বালু পুনঃস্থাপন প্রকল্প হতে যাচ্ছে। অরেঞ্জ কাউন্টি সুপারভাইজার ক্যাটরিনা ফোলি বলেন, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এটি প্রথম পদক্ষেপ। তাঁর মতে, রেললাইন রক্ষার জন্য সৈকতে পর্যাপ্ত বালু থাকা জরুরি। প্রশস্ত বালুময় সৈকত সমুদ্রের ঢেউ ও ভাঙনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষাবেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। রেলপথটির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৪ মাইল উপকূলীয় অংশ রক্ষায় ইতোমধ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ৩০ কোটি ডলারের বেশি অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। এই অর্থের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হতে পারে বালু ফেলার প্রকল্পে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারির মধ্যেই কাজ শুরু হতে পারে। নতুন ১০ বছর মেয়াদি উপকূল উন্নয়ন অনুমোদনের আওতায় রেললাইনের পাশে প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ একটি সমুদ্র প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি আগে জরুরি ভিত্তিতে বসানো বড় পাথরের স্তূপ এবং পাহাড়ের ঢালে স্থাপন করা বিশেষ সংযোগ কাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এসব পাথরের কিছু অংশ সরিয়েও ফেলতে হবে। প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, বালু ফেলার পর অন্তত পাঁচ বছর এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রেলপথের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়েও গবেষণা করতে হবে। এমনকি ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইনটি কোথায় এবং কীভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায়, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। ১৮৮৮ সাল থেকে চালু এই উপকূলীয় রেলপথটি লস অ্যাঞ্জেলেস-সান ডিয়েগো-সান লুইস ওবিসপো রেল করিডরের অংশ। মেট্রোলিংক ও অ্যামট্রাকের প্যাসিফিক সার্ফলাইনার ট্রেনের পাশাপাশি মালবাহী ও সামরিক পরিবহনেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সমুদ্রের খুব কাছ দিয়ে রেললাইনটি চলে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকি রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শক্তিশালী ঢেউ, উচ্চ জোয়ার, ঝড় এবং পাহাড়ি ঢালের মাটি সরে যাওয়ার কারণে বারবার ট্রেন চলাচল বন্ধ করতে হয়েছে। শুধু ২০২১ সালের পর থেকে এসব কারণে রেলপথটি মোট প্রায় ১২ মাস বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে অরেঞ্জ কাউন্টি ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটি (ওসিটিএ)। গত মাসেও উচ্চ জোয়ারের কারণে ট্রেন চলাচল আংশিক বন্ধ হয়ে যায়। এর কয়েক সপ্তাহ আগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ঝড়ের পর উপকূলীয় ভাঙন ও ঢালের ক্ষতির কারণে সাময়িকভাবে রেল চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তবে নতুন প্রকল্প নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, অতীতে রেললাইন রক্ষায় বড় পাথর ফেলার মতো পদক্ষেপ সৈকতের বালু কমিয়ে দিয়েছে। এতে উপকূলের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অথচ রেলপথও পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়নি। সার্ফরাইডার ফাউন্ডেশন, অরেঞ্জ কাউন্টি কোস্টকিপারসহ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন কমিশনের কাছে দেওয়া চিঠিতে ওসিটিএর পরিকল্পনা ও অতীত কার্যক্রমের সমালোচনা করেছে। তারা বালু ফেলার পরও রেললাইনের সমুদ্রপাশে অন্তত ৫০ ফুট প্রশস্ত বালুময় সৈকত বজায় রাখার শর্ত যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। কোস্টাল কমিশনের নির্বাহী পরিচালক কেট হাকলব্রিজ বলেন, এ ধরনের শর্ত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বুঝতে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন। তবে দীর্ঘদিনের ঝুঁকি বিবেচনায় এখনই প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করা জরুরি। তাঁর মতে, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। বিশেষ করে এল নিনোর প্রভাবে উপকূলে শক্তিশালী ঢেউ ও ঝড়ের আশঙ্কা বাড়ায় রেলপথ রক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে বালু পুনঃস্থাপন, সমুদ্র প্রতিরক্ষা দেয়াল এবং ভবিষ্যতে রেললাইন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে এগোচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় রেলপথ রক্ষার উদ্যোগ। তবে এসব ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রের ভাঙন ঠেকাতে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।