বিশ্বজুড়ে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা সুপার এল নিনো আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নতুন এক গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনোর কারণে বাড়তি তাপের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা নয়, বরং বিভিন্ন আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যতথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি মডেলভিত্তিক অনুমান।
এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া চক্র। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও অন্যান্য আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। চলতি বছরের এল নিনো ইতোমধ্যে অস্বাভাবিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং গবেষকদের মতে, এর সঙ্গে মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় চরম তাপের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব-এর গবেষকরা বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। এরপর বিভিন্ন এলাকার মৌসুমি তাপমাত্রার পূর্বাভাসের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে এল নিনোর কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কত অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে, তার একটি হিসাব তৈরি করা হয়েছে। গবেষণায় ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সালের গড় সময়কে তুলনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এর ফলে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চরম তাপমাত্রার দিন প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা কম, সেসব এলাকায় মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে। গবেষণার অনুমানে নাইজেরিয়ায় এল নিনো-সম্পর্কিত অতিরিক্ত তাপের কারণে প্রায় ৩১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিলও বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও শীর্ষ ২০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর অনুমান করা হয়েছে।
তবে গবেষণাটি এখনো পিয়ার-রিভিউড বা বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়নি। যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক রাকেল নুনেস, যিনি গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত নন, বলেছেন ৪ লাখ ৫১ হাজার মৃত্যুর হিসাবটি একটি মডেলিং অনুশীলন হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কিন্তু এটিকে নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা উচিত নয়। তার মতে, এই হিসাবের মূল গুরুত্ব হলো সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা তুলে ধরা এবং প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা বোঝানো।
গবেষকদের মতে, এল নিনোর প্রভাব শুধু অতিরিক্ত গরমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে খরা, দাবানল ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনাও বাড়তে পারে, যার ফলে আরও মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে খরা, দাবানল ও পানির সংকটের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে আগাম হিট অ্যালার্ট, জরুরি স্বাস্থ্য পরিকল্পনা, কুলিং সেন্টার ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, গরমের সময় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত কর্মী এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, সময়মতো এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সম্ভাব্য অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ৪ লাখ ৫১ হাজার মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ঘটনা নয়—এটি একটি গবেষণাভিত্তিক সম্ভাব্য হিসাব। তবে শক্তিশালী এল নিনো এবং ইতোমধ্যে চলমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন একসঙ্গে কাজ করলে আগামী কয়েক মাসে চরম তাপের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।