ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস এঞ্জেলেসে আবাসিক বাড়িগুলোকে কেন্দ্র করে পরিচালিত গোপন পতিতালয়ের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। অভিযান চালিয়ে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কয়েকজন আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন। তবে তদন্তকারীদের ধারণা, পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত মূল সংগঠক এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছেন।
২০২৪ সালে সান ভ্যালির একটি বাড়ি থেকে এক নারীর জরুরি ফোনকল পাওয়ার পর ঘটনাটি পুলিশের নজরে আসে। ওই নারী চীনা ভাষায় পুলিশকে জানান, তাঁকে একটি বাড়িতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁকে দ্রুত উদ্ধারের অনুরোধ জানিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ফোন ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পারলে তাঁকে মারধর করা হতে পারে।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর ওই নারীকে আর খুঁজে পায়নি। তবে বাড়িটিতে তল্লাশি চালিয়ে গোয়েন্দারা যৌন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সামগ্রী ও স্যুটকেস দেখতে পান। পরবর্তী তদন্তে সান ফার্নান্দো ভ্যালির বিভিন্ন আবাসিক বাড়িতে পরিচালিত গোপন পতিতালয়ের সঙ্গে ওই বাড়ির যোগসূত্র পাওয়া যায়।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কে অন্তত ১০টি আবাসিক পতিতালয় ছিল। এর কার্যক্রম সান গ্যাব্রিয়েল ভ্যালি, অরেঞ্জ কাউন্টি এবং ইনল্যান্ড এম্পায়ার এলাকার কিছু স্থান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
নেটওয়ার্কটি পরিচালনায় একটি কেন্দ্রীয় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হতো। সম্ভাব্য গ্রাহকেরা মুঠোফোনে নিজেদের বয়স, জাতীয়তা ও অবস্থানের তথ্য পাঠাতেন। এরপর তাঁদের নির্দিষ্ট বাড়ির ঠিকানা জানানো হতো। বিভিন্ন স্থানের জন্য আলাদা সেবার তালিকা ও মূল্যও নির্ধারিত ছিল। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০ মিনিটের একটি সেবার মূল্য ছিল ১৪০ ডলার, আর এক ঘণ্টার বিশেষ প্যাকেজের মূল্য ছিল ৩০০ ডলার পর্যন্ত।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কয়েকজন নারীকে ম্যাসাজের কাজের কথা বলে লস এঞ্জেলেসে আনা হয়েছিল। পরে তাঁদের যৌন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয় বলে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন কয়েকজন নারী। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ জানান, পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইচ্যাটে যোগাযোগ করে তাঁরা এই কাজের প্রস্তাব পেয়েছিলেন।
আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, কিছু নারীকে গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ পরিচালকদের দিতে হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে থাকা-খাওয়ার খরচের পাশাপাশি প্রত্যেক গ্রাহকের জন্য আলাদা অর্থও আদায় করা হতো। একজন নারী জানান, তাঁকে প্রতিদিন প্রায় ১০ জন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে হতো। তিনি বলেন, সরাসরি জোর করা না হলেও ভয় এবং পরিচিত কেউ না থাকায় তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারছিলেন না।
তবে নেটওয়ার্কটির সঙ্গে যুক্ত সব নারী একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেননি। কয়েকজন আদালতে জানিয়েছেন, তাঁরা স্বেচ্ছায় অর্থের বিনিময়ে যৌন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন। ফলে তদন্তে উঠে আসা প্রতিটি ঘটনাকে একই ধরনের জবরদস্তি বা মানব পাচারের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন বাড়ির ব্যবস্থাপক ও কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি দালালি ও যৌন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন। তাঁদের মধ্যে জিয়েই ঝাং এবং আলী আলওবাদির নাম রয়েছে। তাঁদের কারাদণ্ডের পরিবর্তে দুই বছরের প্রবেশনসহ বিভিন্ন শর্ত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আদালতের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট সময় নিয়ম মেনে চলতে হবে তাঁদের।
কিন্তু এসব গ্রেপ্তার ও সাজা নেটওয়ার্কটির কথিত মূল সংগঠকদের শনাক্ত বা বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি আনতে পারেনি। তদন্তে ‘চেরিশ’, ‘চেরি’ এবং ‘পারফেক্ট’ নামের কয়েকটি অনলাইন পরিচয়ের উল্লেখ পাওয়া গেছে। এগুলো একই ব্যক্তির ছদ্মনাম কি না, তা নিশ্চিত নয়।
তদন্তকারীদের নথিতে ক্যান্ডি ডিং নামের এক নারীর সঙ্গে ‘চেরিশ’ পরিচয়ের যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, তিনি নেটওয়ার্কটির অন্তত একটি অংশ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্বামী হংশান ওয়াংয়ের নামও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এই পতিতালয় নেটওয়ার্কসংক্রান্ত মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
এই ঘটনায় পুলিশের তদন্তপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আদালতে এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘পারফেক্ট’ নামে পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় অনুসন্ধানে তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ নেননি। অথচ সাক্ষীদের বক্তব্যে এই পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে নেটওয়ার্কের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লস এঞ্জেলেসের এই ঘটনা দেখিয়েছে, আবাসিক বাড়ি, অনলাইন যোগাযোগ এবং একাধিক মধ্যস্থতাকারীকে ব্যবহার করে কীভাবে গোপন যৌন ব্যবসার নেটওয়ার্ক পরিচালিত হতে পারে। কয়েকজন ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কথিত মূল সংগঠকদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করা তদন্তকারীদের জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।