জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার পরিচিত সান্তা আনা বাতাসের প্রবাহ দুর্বল হয়ে আসছে। তবে এতে লস এঞ্জেলেসসহ দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে না। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সান্তা আনা বাতাসের দুর্বল ও মাঝারি মাত্রার প্রবাহের ঘটনা কমছে। কিন্তু যে প্রবল বাতাসগুলো সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক দাবানল ছড়িয়ে দেয়, সেগুলোর তীব্রতা কমার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বাতাসের সামগ্রিক প্রবাহ কমলেও দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দাদের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকেই যাচ্ছে।
সান্তা আনা বাতাস মূলত নেভাডা ও ইউটার আশপাশের শুষ্ক অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের দিকে প্রবাহিত হয়। অভ্যন্তরীণ মরুভূমি অঞ্চল ও উপকূলের মধ্যে তাপমাত্রা এবং বায়ুচাপের পার্থক্য এই বাতাস তৈরিতে ভূমিকা রাখে। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচে নামার সময় বাতাস সংকুচিত হয়ে আরও উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে ওঠে। পাহাড়ি গিরিপথ ও উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এর গতি আরও বেড়ে যেতে পারে।
এ ধরনের বাতাস গাছপালা ও আশপাশের উদ্ভিদের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। কোথাও আগুন লাগলে প্রবল বাতাস মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে। আগুনের জ্বলন্ত কণা বাতাসে ভেসে এক মাইলেরও বেশি দূরে গিয়ে পড়তে পারে। এতে আগুনের মূল উৎস থেকে দূরের বাড়িঘরেও নতুন করে আগুন ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। দমকলকর্মীদের পক্ষে একই সঙ্গে এতগুলো স্থানে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সান্তা আনা বাতাসের মোট প্রবাহের ঘটনা প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমতে পারে। তবে এই পরিবর্তন মূলত দুর্বল ও মাঝারি মাত্রার বাতাসের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। সবচেয়ে শক্তিশালী বাতাসের ক্ষেত্রে একই ধরনের হ্রাসের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে সামগ্রিকভাবে বাতাসের প্রবাহ কমলেও ভয়াবহ দাবানলের আশঙ্কা দূর হচ্ছে না।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লস এঞ্জেলেসে প্যালিসেডস ও ইটন দাবানলের ভয়াবহতা এই ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ। প্রবল বাতাস ও অত্যন্ত শুষ্ক পরিস্থিতির কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং হাজার হাজার বাড়িঘর ও স্থাপনা ধ্বংস হয়।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি প্রভাব হলো বৃষ্টিপাতের ধরনে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি। শীতকালে সান্তা আনা বাতাস প্রবাহিত হওয়ার সময়ও যদি পরিবেশ ও গাছপালা অতিরিক্ত শুষ্ক থাকে, তাহলে আগুন ছড়ানোর অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে দাবানলের ঝুঁকিপূর্ণ সময়সীমা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বাড়িঘরকে আগুনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বাড়ির আশপাশ থেকে শুকনো পাতা ও দাহ্য বস্তু সরিয়ে রাখা, ঘরের কাছাকাছি কাঠের বেড়া ও দাহ্য স্থাপনা এড়ানো এবং বাতাসে ভেসে আসা জ্বলন্ত কণা প্রবেশ করতে পারে এমন ছিদ্র সুরক্ষিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
গবেষকদের বক্তব্য, সান্তা আনা বাতাস দুর্বল হওয়া কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও একে দাবানলের ঝুঁকি কমে যাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রবল বাতাস, শুষ্ক পরিবেশ এবং আগুনের সম্ভাব্য উৎস—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।