ক্যালিফোর্নিয়ায় ধনকুবেরদের সম্পদের ওপর এককালীন কর আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাশিত জনসমর্থন পায়নি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের মধ্যেও রাজ্যটির বিতর্কিত বিলিয়নেয়ার কর প্রস্তাব নিয়ে ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি দেখা গেছে। স্বাস্থ্যসেবায় অর্থের জোগান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আনা এই উদ্যোগের বিপক্ষে প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে ধনকুবের ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও এ নিয়ে মতবিরোধ ছিল।
প্রস্তাবটির নাম ছিল প্রপোজিশন ৪০। এটি পাস হলে ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিকদের ওপর একবারের জন্য ৫ শতাংশ কর আরোপ করা হতো। প্রস্তাবের উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য ছিল প্রায় ২০০ বিলিয়নেয়ারের সম্পদের ওপর কর বসিয়ে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা। এর বড় অংশ স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় করার পরিকল্পনা ছিল।
প্রস্তাবটির সমর্থকেরা বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময় ফেডারেল স্বাস্থ্যসেবা তহবিলে কাটছাঁটের ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যে অর্থের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, তা পূরণে এই কর সহায়তা করবে। এ উদ্যোগের পক্ষে ছিলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, ক্যালিফোর্নিয়া ডেমোক্রেটিক পার্টি, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অভিনেতা মার্ক রাফালোর মতো হলিউডের পরিচিত ব্যক্তিরা।
তবে প্রস্তাবটির বিরোধিতাও ছিল জোরালো। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম, শিক্ষক সংগঠন, প্ল্যানড প্যারেন্টহুড, বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠন এবং প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এর বিরোধিতা করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, সম্পদের ওপর অতিরিক্ত কর বসালে ধনকুবেররা অন্য অঙ্গরাজ্যে চলে যেতে পারেন। এতে ক্যালিফোর্নিয়া শুধু প্রস্তাবিত করের অর্থই হারাবে না, ধনীদের কাছ থেকে বর্তমানে যে আয়কর পায়, সেটিও কমে যেতে পারে। নির্বাচনে জয়ী পরবর্তী গভর্নর জাভিয়ের বেসেরাও এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন।
ভোট গণনার প্রাথমিক হিসাবেও প্রস্তাবটির পক্ষে প্রত্যাশিত সমর্থন দেখা যায়নি। বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৫৬ শতাংশ ভোটার প্রস্তাবটির বিপক্ষে এবং ৪৪ শতাংশ পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে জানা যায়। তবে তখনো প্রায় ৬০ লাখ ভোট গণনা বাকি ছিল। ফলে ফলাফল চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি।
প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে প্রচারণায় অর্থের ব্যবধানও ছিল বড়। ক্যালিফোর্নিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেটের তথ্য অনুযায়ী, প্রপোজিশন ৪০ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুটি প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে মোট প্রায় ৪৮৯ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে বিলিয়নেয়ার কর ঠেকানোর প্রচারণায়। অন্যদিকে সমর্থকেরা পেয়েছেন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার।
গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিনসহ প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন ধনকুবের 'বিল্ডিং আ বেটার ক্যালিফোর্নিয়া' নামের একটি প্রচারগোষ্ঠীকে অর্থ দিয়েছেন। এই গোষ্ঠী বিলিয়নেয়ার করের বিরোধিতার পাশাপাশি প্রস্তাবটি আটকে দিতে পারে—এমন দুটি বিকল্প প্রস্তাবের পক্ষেও প্রচারণা চালায়।
বিরোধীদের বিজ্ঞাপনে বলা হয়, এই কর শুধু ধনীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ও রাজ্যের রাজস্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। অন্যদিকে সমর্থকদের পক্ষে প্রচারণার পরিসর ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যান শ্নুরের মতে, প্রচারণায় অর্থের অসমতা প্রস্তাবটির পক্ষে জনসমর্থন ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলেছিল। তাঁর পর্যবেক্ষণ, বিরোধীদের প্রচারণায় শুধু ধনকুবেরদের নয়, শিক্ষক, নার্স ও অগ্নিনির্বাপণকর্মীদেরও সামনে আনা হয়েছিল। ফলে করের বিরোধিতা কেবল ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অবস্থান হিসেবে দেখা যায়নি।
আরেকটি বড় সমস্যা ছিল সম্পদের ওপর কর আরোপের পদ্ধতি। সাধারণত আয়ের ওপর কর হিসাব করা তুলনামূলক সহজ হলেও শেয়ার, ব্যবসায়িক মালিকানা ও অন্যান্য সম্পদের মূল্য নির্ধারণ জটিল। এসব সম্পদের বাজারমূল্য নিয়মিত ওঠানামা করে। ফলে একজন ব্যক্তির মোট সম্পদ কত, তা নির্ধারণ এবং কর আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এমনকি যাঁরা বিলিয়নেয়ার নন, তাঁদের মধ্যেও উদ্বেগ ছিল—আজ ধনীদের সম্পদের ওপর কর বসানোর সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত সম্পদের অন্য অংশেও একই ধরনের কর আরোপের পথ খুলে যেতে পারে কি না।
প্রস্তাবটির বিরোধীদের সমর্থনে আনা প্রপোজিশন ৪২-ও ভোটের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি পাস হলে অবসরকালীন সঞ্চয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদ ও ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপর নতুন কর আরোপে বাধা তৈরি হতো। একই সঙ্গে অতীতের তারিখ থেকে কর কার্যকরের সুযোগও সীমিত করার কথা ছিল। প্রাথমিক ফলাফলে প্রস্তাবটি পাসের পথে ছিল। অন্যদিকে নতুন বিশেষ করের ক্ষেত্রে নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রপোজিশন ৪১ পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছিল।
বিলিয়নেয়ার করের সমর্থকেরা অবশ্য লড়াই শেষ হয়েছে বলে মনে করছেন না। প্রস্তাবটির প্রধান উদ্যোক্তা সংগঠন এসইআইইউ-ইউএইচডব্লিউর কর্মকর্তা সুজান জিমেনেজ বলেছেন, রাজ্যের আইনপ্রণেতারা স্বাস্থ্যসেবা রক্ষায় কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের সংগঠন ২০২৮ সালে আবারও বিলিয়নেয়ার করের প্রস্তাব ভোটারদের সামনে আনতে পারে।
সব মিলিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার এই ভোট দেখিয়েছে, ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর ধারণার প্রতি সমর্থন থাকলেও কর আরোপের পদ্ধতি, অর্থনৈতিক প্রভাব, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ব্যাপক প্রচারণা ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রপোজিশন ৪০-এর চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিত নয়। তবে এই বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রে ধনসম্পদের বৈষম্য ও অতি ধনীদের করের আওতায় আনার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।