নিউইয়র্ক

তিব্বতের স্বাধীনতার দাবিতে জাতিসংঘের সামনে আত্মাহুতি, মারা গেলেন তিব্বতি আন্দোলনকারী

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের (ইউএন) সদর দপ্তরের সামনে নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন এক তিব্বতি ব্যক্তি। চীনের তিব্বত শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিউইয়র্ক পুলিশ (এনওয়াইপিডি) জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জরুরি নম্বরে ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা ৫২ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে শরীরের বেশিরভাগ অংশে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় দেখতে পায়। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়। তিব্বতের নির্বাসিত সরকার এবং নিউইয়র্কভিত্তিক এক তিব্বতি অধিকারকর্মী নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করে জানান, তার নাম লোবগা রাংজেন (লোবসাং পালদেন নামেও পরিচিত)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার নামে থাকা একটি লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি তিব্বতের পতাকা হাতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বিপরীতে ফার্স্ট অ্যাভিনিউতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে দুজন ব্যক্তি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। একই ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে লোবগা রাংজেন তিব্বতিদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে "তিব্বতের স্বাধীনতার জন্য কাজ করার" আহ্বান জানান। তিনি তিব্বতিদের নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও জাতীয় পরিচয় কখনও ভুলে না যাওয়ারও অনুরোধ করেন। ভিডিওতে তিনি অভিযোগ করেন, চীনা সরকার এমন নীতি গ্রহণ করেছে, যার উদ্দেশ্য তিব্বতিদের পরিচয়, সংস্কৃতি ও ভাষাকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করা। এই ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন কয়েক দিন আগে চীন নতুন একটি জাতিগত ঐক্য আইন কার্যকর করেছে। নতুন আইনে জাতিগত সংখ্যালঘু অঞ্চলের স্কুল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে চীনা ভাষার ব্যবহার আরও বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি "চীনা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ" করার কথাও বলা হয়েছে। তিব্বতি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, নতুন এই আইন চীনের বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় আরও সংকটের মুখে ফেলবে। তবে বেইজিং দাবি করছে, আইনটি দেশের সব জাতিগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার জন্যই করা হয়েছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৫১ সাল থেকে তিব্বত শাসন করছে। বেইজিংয়ের দাবি, তিব্বত বহু শতাব্দী ধরেই চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে, তিব্বতের পতাকাকে চীনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং এটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। নির্বাসিত তিব্বতি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে চীনের শাসনের প্রতিবাদে বহু তিব্বতি আত্মাহুতি দিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে তিব্বতি সমর্থক ও মানবাধিকারকর্মীরা জড়ো হয়ে প্রতিবাদ ও শোক সমাবেশ করেন। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিব্বতের নির্বাসিত সরকারের প্রধান পেনপা সেরিং এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, লোবগা রাংজেনের আত্মত্যাগ সম্মানের হলেও মানুষের জীবন অমূল্য এবং তিব্বতের দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের স্বার্থে জীবন রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র শুক্রবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেন, "শিজাং (তিব্বতের জন্য চীনের ব্যবহৃত নাম) প্রাচীনকাল থেকেই চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।" অন্যদিকে জাতিসংঘের এক মুখপাত্র জানান, ঘটনাটি দিনের নির্ধারিত বৈঠক শেষ হওয়ার পর ঘটেছে। ফলে জাতিসংঘের কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম এতে ব্যাহত হয়নি।

এলএবাংলাটাইমস/ওএম