যুক্তরাষ্ট্র সরকার দক্ষিণ আফ্রিকায় এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থায়ন বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের বিরুদ্ধে আফ্রিকানার (শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু) জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের কোনো নোটিশ পায়নি। তবে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য খাতে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টস ইমার্জেন্সি প্ল্যান ফর এইডস রিলিফ (পেপফার) কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বছরে প্রায় ৪০ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়া হতো। এই অর্থ দেশটির মোট এইচআইভি কর্মসূচির ব্যয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জোগান দিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতি হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর তিনি এক নির্বাহী আদেশে অভিযোগ করেন যে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন নীতি সমান সুযোগ নষ্ট করছে এবং নির্দিষ্ট শ্বেতাঙ্গ ভূমিমালিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার বলছে, তাদের ব্ল্যাক ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট নীতি বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার (অ্যাপারথেইড) সময়কার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য প্রয়োজনীয়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা এবং ইরানের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এসব ‘অন্যায্য ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ কারণে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভবিষ্যতে আর সহায়তা দেওয়া হবে না।
এর আগে ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা’ চলছে বলেও দাবি করেছিলেন। এ দাবির ভিত্তিতে আফ্রিকানারদের জন্য বিশেষ শরণার্থী কর্মসূচি চালু করা হয়। তবে ‘শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা’র অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং অবিশ্বস্ত বলে বিবেচিত।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে পেপফার তহবিল ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হবে। তার ভাষ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রশাসনের নীতিগত বিভিন্ন অনুরোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
তবে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো দক্ষিণ আফ্রিকাকে আরও স্বনির্ভর করা এবং মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার নিজস্ব স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পেপফার কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ সরবরাহের অর্থায়ন মূলত দেশটির সরকারই করে থাকে। ফলে রোগীদের চিকিৎসা অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশা করছে।
দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিভিন্ন প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্প ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার মধ্যে অনুষ্ঠিত এক আলোচিত বৈঠকও ছিল, যেখানে ট্রাম্প শ্বেতাঙ্গদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেন।
এদিকে, গত নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনও যুক্তরাষ্ট্র বয়কট করেছিল, যা দুই দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম