হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালিয়েছে, ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাবে মঙ্গলবার তারা ইরানের ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে "শক্তিশালী" হামলা চালায়। সেন্টকমের দাবি, হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, কমান্ড সেন্টার এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৬০টি ছোট নৌযানও ধ্বংস করা হয়েছে বলে তারা জানায়।
তবে ট্যাংকারে হামলার দায় ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। বুধবার ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দপ্তর ও একটি বিমানঘাঁটিসহ মোট ৮৫টি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কেশম দ্বীপ, বান্দার আব্বাস ও সিরিক এলাকায় আঘাত হানা হয়েছে। বিস্ফোরণের শার্পনেলের আঘাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এদিকে কুয়েত ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে "বারবার সংঘটিত আগ্রাসন" বলে উল্লেখ করেছে।
ন্যাটো মহাসচিব Mark Rutte আঙ্কারায় জোটের শীর্ষ সম্মেলনে বলেন, তেলবাহী জাহাজে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ "একেবারেই প্রয়োজনীয়" ছিল। তার ভাষায়, ইরান কার্যত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে এবং এ ধরনের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় প্রতিক্রিয়া জরুরি ছিল।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার Mohammad Bagher Ghalibaf অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘন করেছে। তার দাবি, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নেওয়া ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ, নতুন করে তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং দক্ষিণ ইরানে হামলার মাধ্যমে ওয়াশিংটন চুক্তি ভঙ্গ করেছে। তিনি বলেন, "ভয় দেখিয়ে বা চাপ দিয়ে ইরানকে নত করা যাবে না।"
এর আগে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীও যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে "কঠোর জবাব" দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
যুক্তরাষ্ট্র হামলার আগে ইরানের ওপর সাময়িকভাবে শিথিল করা তেল নিষেধাজ্ঞার ছাড় প্রত্যাহার করে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্তকে সমঝোতা ভঙ্গের প্রমাণ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের "অসৎ উদ্দেশ্য, অসঙ্গতি এবং অবিশ্বস্ততার" পরিচয় বহন করে। তেহরান নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে কাতার ও সৌদি আরবও অভিযোগ করেছে, তাদের দেশের একটি করে তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হয়েছে এবং এর জন্য তারা ইরানকে দায়ী করেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র Majed Al Ansari বলেন, 'আল-রেকাইয়াত' নামের একটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার জন্য ইরান সম্পূর্ণভাবে দায়ী। সৌদি আরবও জানিয়েছে, 'ওয়াদিয়ান' নামের তাদের একটি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র Esmail Baghaei এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া চলাচল করা বা জাহাজের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা পরিবর্তন করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, সোমবার একটি ট্যাংকারের ইঞ্জিন কক্ষে অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আগুন লাগে। মঙ্গলবার আরও দুটি পৃথক ঘটনায় দুটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেগুলো নিরাপদে গন্তব্যের দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সামরিক উত্তেজনা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা এবং সব ধরনের সংঘাতের অবসান ঘটানো। ওই চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান, ওমান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্সের দাবি, নতুন সমঝোতা অনুযায়ী ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ইরান ও ওমানের সমন্বয়ে পরিচালিত হবে এবং প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে সেবামূলক ফি নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম