আমেরিকা

যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের বৈধ অভিবাসনে কড়াকড়ি বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কমাতে বৈধ অভিবাসনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই কড়াকড়ি বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা (USCIS)-এর কিছু আবেদন আটকে রাখা এবং বিদেশে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটের মাধ্যমে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া ধীর বা স্থগিত করা। এসব নীতির প্রভাব পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের ওপরও। যারা স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা কিংবা অন্য পরিবারের সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য আবেদন করছেন, তারাও সমস্যায় পড়ছেন। একইভাবে কর্মী নিয়োগ দিতে চাওয়া মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু নতুন অভিবাসন নীতির কারণে দেশটির শ্রমবাজারে কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী। ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান পলিসির (NFAP) জানুয়ারি ২০২৬-এর এক বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে তার চার বছরের মেয়াদ শেষে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসন ৩৩ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এর অর্থ, প্রায় ১৫ লাখ থেকে ২৪ লাখ কম বৈধ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেন। NFAP-এর আরেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অভিবাসন কমে যাওয়ার কারণে ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ‘কর্মী-বছর’ শ্রমঘাটতি তৈরি হতে পারে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই ঘাটতি ১০ কোটি ২০ লাখ কর্মী-বছরে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এসব নীতির কারণে ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার কমতে পারে। ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই ক্ষতির পরিমাণ ১২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রভাব পড়েছে ডাইভারসিটি ভিসা বা গ্রিন কার্ড লটারিতেও। প্রায় ৫৫ হাজার ডাইভারসিটি ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ রয়েছে। এই কর্মসূচি বন্ধ করার চেষ্টা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও করা হয়েছিল। প্রশাসন ডাইভারসিটি ভিসা স্থগিতের কারণ হিসেবে ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে হামলার ঘটনায় জড়িত এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছে। ওই ব্যক্তি আট বছর আগে ডাইভারসিটি ভিসা লটারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেয়েছিলেন। ওই হামলায় ব্রাউন ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপকসহ দুজন নিহত হন। সমালোচকদের অভিযোগ, কোনো একটি ঘটনার পর পুরো অভিবাসন ব্যবস্থা আরও কঠোর করার নীতি নিয়েছে প্রশাসন। ২০২৬ অর্থবছরের ডাইভারসিটি ভিসা পাওয়া ব্যক্তিদের ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ভিসা বা বৈধ মর্যাদা না মিললে পরে আর এই কর্মসূচি থেকে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। শরণার্থী গ্রহণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের ছাড়া প্রায় সব শরণার্থীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। NFAP-এর হিসাবে, শরণার্থী গ্রহণের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার ফলে চার বছরে বৈধ অভিবাসন প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার কমতে পারে। এ ছাড়া গত বছরের ১৬ ডিসেম্বরের একটি ঘোষণায় ৩৯টি দেশের নাগরিকদের ওপর বিভিন্ন মাত্রায় অভিবাসী ও অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তালিকায় রয়েছে নাইজেরিয়া, জিম্বাবুয়ে, ভেনেজুয়েলা, আফগানিস্তান ও হাইতির মতো দেশ। এরপর ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি মার্কিন প্রশাসন আরও ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিতের ঘোষণা দেয়। সরকারের ভাষ্য, এসব দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সহায়তার ওপর ‘অগ্রহণযোগ্য মাত্রায়’ নির্ভর করছেন। দুই তালিকায় কিছু দেশের নাম একই হওয়ায় মোট ৯৩টি দেশের নাগরিক এই দুই ধরনের বিধিনিষেধের আওতায় পড়েছেন। NFAP-এর হিসাবে, ২০২৩ অর্থবছরে এই ৯৩ দেশ থেকে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার ৪৬০ জন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ২ লাখ ৬ হাজার ৫৫০ জন ছিলেন মার্কিন নাগরিকদের স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা বাবা-মা। বিষয়টি নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা চলছে। জুনে একটি ফেডারেল আদালত বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আবেদন আটকে রাখা এবং আবেদন নিষ্পত্তি না করার USCIS নীতি বাতিল করে। জুলাইয়ে আরেকটি আদালত এই রায় স্থগিত রাখার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদনও নাকচ করে। বৈধ অভিবাসন সীমিত করার নীতির বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা চলছে। এর মধ্যে ডাইভারসিটি ভিসা স্থগিতের বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় ২৭ আগস্ট শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। ৭৫টি দেশের নাগরিকদের ওপর ভিসা স্থগিতের বিরুদ্ধেও ২১ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন নির্ধারিত হয়েছে। এদিকে বৈধ অভিবাসন আরও কঠোর করতে ‘পাবলিক চার্জ’ নীতিতেও পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নতুন নিয়ম প্রকাশ করে সরকার কর্মকর্তাদের স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এর ফলে কোনো মার্কিন নাগরিক তার স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা কিংবা ভাই-বোনকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার আবেদন করলেও ভবিষ্যতে ওই ব্যক্তি সরকারি সুবিধা নেবেন কি না বা কত আয় করবেন—এমন অনুমানের ভিত্তিতে আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুযোগ বাড়তে পারে। অভিবাসন আইনজীবীদের মতে, নতুন নিয়মের ফলে আবেদনকারীদের ভাগ্য অনেক বেশি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। বৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। H-1B ভিসাধারী এবং অন্যান্য কর্মভিত্তিক অভিবাসীদের জন্য নির্ধারিত মজুরি বাড়ানোর একটি প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে অনেক দক্ষ বিদেশি কর্মীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া স্থায়ী বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম সনদ পাওয়ার নিয়মও আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়তে পারে এবং কর্মভিত্তিক গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও কঠিন হতে পারে। অভিবাসন নীতির এসব পরিবর্তনের ফলে ২০২৬ সালে বৈধ অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং ২০২৭ ও ২০২৮ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিকদের ওপর, যারা স্বামী-স্ত্রীসহ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের দেশটিতে আনার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে কর্মী সংকটের কারণে মার্কিন অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়তে পারে।

এলএবাংলাটাইমস/ওএম