যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে তিন সন্তান হত্যার মামলায় অভিযুক্ত লিন্ডসে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না বলে জানিয়েছেন মামলার একমাত্র ভিন্নমত পোষণকারী জুরি সদস্য মাইকেল ডেসরনভিল।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ডেসরনভিল বলেন, আদালতে উপস্থাপিত শারীরিক প্রমাণ, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের বক্তব্য এবং প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ তার কাছে যথেষ্ট মনে হয়েছে। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিশ্বাস, ক্ল্যান্সি সন্তানদের হত্যার সময় কী করছেন তা জানতেন এবং হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিলেন।
ডেসরনভিল বলেন, ‘আমার কোনো সন্দেহ ছিল না।’
৩৬ বছর বয়সী লিন্ডসে ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে পাঁচ বছর বয়সী কোরোরা, তিন বছর বয়সী ডসন এবং আট মাস বয়সী ক্যালানকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ম্যাসাচুসেটসের পারিবারিক বাড়িতে তিন সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর দ্বিতীয় তলার একটি জানালা দিয়ে লাফ দেন তিনি।
ক্ল্যান্সি সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তার আইনজীবীদের দাবি, ঘটনার সময় তিনি ‘পোস্টপার্টাম সাইকোসিস’ নামে গুরুতর একটি মানসিক অবস্থার মধ্যে ছিলেন। এ কারণে তিনি নিজের কাজের প্রকৃতি বুঝতে বা ঠিক-ভুলের পার্থক্য করতে সক্ষম ছিলেন না বলে দাবি করেন তারা।
অন্যদিকে প্রসিকিউশনের দাবি, সন্তানদের হত্যার ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত।
ক্ল্যান্সিকে হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করতে জুরিদের সর্বসম্মতভাবে নিশ্চিত হতে হতো যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তানদের হত্যা করেছেন এবং হত্যার সময় পোস্টপার্টাম সাইকোসিসের কারণে তিনি ফৌজদারি দায় থেকে মুক্ত ছিলেন না।
কিন্তু প্রায় ৪০ ঘণ্টা আলোচনা করেও ১২ সদস্যের জুরি কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। পরে গত ৪ সেপ্টেম্বর বিচারক মামলাটিতে মিস্ট্রায়াল ঘোষণা করেন।
মিস্ট্রায়ালের পর কয়েকজন জুরি জানান, শেষ পর্যন্ত তারা ১১-১ অবস্থানে পৌঁছেছিলেন। ১১ জন জুরি ক্ল্যান্সিকে মানসিক অসুস্থতার কারণে ফৌজদারি দায় থেকে মুক্ত করার পক্ষে ছিলেন। বিপরীতে ডেসরনভিল তাকে দায়মুক্ত করার পক্ষে রাজি হননি।
অন্য জুরি পলা ডেভলিন জানান, কয়েক দিন ধরে তারা ডেসরনভিলকে তার অবস্থান পরিবর্তনে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। জুরি ফোরপারসনও পুরো ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ’ এবং ‘মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন’ অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
আরেক জুরি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, অধিকাংশ জুরি শুরু থেকেই নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় ছিলেন। তবে ডেসরনভিল তার কথিত ‘যৌক্তিক সন্দেহের’ কারণ পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছিলেন না বলে তাদের মনে হয়েছিল।
এদিকে মামলার বিচার চলাকালে ক্ল্যান্সির মানসিক অবস্থার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে তার আইনজীবীরা। সন্তান হত্যার আগে তাকে একাধিক ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া তিনি আত্মহত্যা-সংক্রান্ত হটলাইনে যোগাযোগ করেছিলেন এবং জরুরি বিভাগেও চিকিৎসা নিয়েছিলেন। এসব ঘটনাকে তার মানসিক অসুস্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন তারা।
প্রতিরক্ষার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া একজন ফরেনসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, সন্তানদের হত্যার সময় ক্ল্যান্সি ‘কমান্ড হ্যালুসিনেশন’ ও ‘ডিলিউশন অব ইনফ্লুয়েন্স’-এর মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন।
তবে প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া তার একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ক্ল্যান্সির সঙ্গে চিকিৎসা সেশনের সময় তিনি তার মধ্যে সাইকোসিসের কোনো লক্ষণ দেখেননি।
মিস্ট্রায়ালের কারণে মামলাটির এখনো কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। প্রসিকিউশন নতুন করে বিচার চাইবে কি না, তা এখনো জানায়নি।
ক্ল্যান্সির আইনজীবী কেভিন রেডিংটন জানিয়েছেন, তিনি প্রসিকিউশনের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফার বিচার এড়ানোর আশা করছেন। তিনি ডেসরনভিলের অবস্থানের সমালোচনা করে বলেন, ওই জুরি বিচারকের দেওয়া ‘যৌক্তিক সন্দেহ’ সম্পর্কিত নির্দেশনা সঠিকভাবে প্রয়োগ করেননি।
মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর ম্যাসাচুসেটসের প্লাইমাউথ সুপিরিয়র কোর্টে হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে নিহত তিন শিশুর বাবা ও ক্ল্যান্সির সাবেক স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সি রোববার সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে মামলাটি নিয়ে কথা বলবেন। সন্তানদের হারানোর শোক, তাদের স্মৃতি এবং মামলা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নিয়েও তিনি কথা বলবেন বলে জানা গেছে।