ফিলাডেলফিয়া শহরের একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ছবি ও ভিডিওতে পাঁচ নারীকে মৃত অবস্থায় দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ওই নারীরা নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে ভিডিওগুলোর সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মরদেহও উদ্ধার হয়নি।
ফিলাডেলফিয়ার ওলনি এলাকায় অবস্থিত বাড়িটিতে ৪৪ বছর বয়সী ইউজিন হর্শ তার বাবার সঙ্গে থাকতেন। সম্প্রতি সেখানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল ছবি ও ভিডিও, অস্ত্র, মাদক, ভুয়া পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য সন্দেহজনক সামগ্রী উদ্ধার করে পুলিশ।
বুধবার পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে। এসব ভিডিওতে দেখা ঘটনাগুলো বাস্তবে ঘটেছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
অবৈধ পার্কিং থেকে তদন্তের সূত্রপাত
পুলিশের নথি অনুযায়ী, গত জুনে ফিলাডেলফিয়ার ইন্ডিপেনডেন্স ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল পার্কের কাছে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি অবৈধভাবে পার্ক করা অবস্থায় দেখতে পান এক পার্ক রেঞ্জার।
গাড়ির ভেতরে ইউজিন হর্শ ও এক নারীকে পাওয়া যায়। সেখানে মাদক, ভুয়া ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাজ এবং গুলিও ছিল বলে জানায় পুলিশ। ওই নারীর কাছে ব্লেয়ার টনজেল্লি নামে অন্য এক নারীর পরিচয়পত্র পাওয়া যায়। টনজেল্লি ২০২৩ সাল থেকে নিখোঁজ।
এরপর ইউজিন হর্শকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার বাড়িতে তল্লাশি চালায় কর্তৃপক্ষ। পুলিশের অভিযোগ, বাড়ির বেসমেন্ট ও গোপন জায়গাগুলোতে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ, গুলির আলামত, গাঁজা উৎপাদনের ব্যবস্থা এবং বাড়ির পানির লাইনের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় ড্রাম পাওয়া যায়।
তল্লাশিতে পুলিশ ১০ লাখের বেশি ডিজিটাল ফাইল উদ্ধার করে। এসব ছবি ও ভিডিওতে ওই বাড়ির ভেতরে অনেক মানুষ, বিশেষ করে নারীদের বিভিন্ন অবস্থায় দেখা যায় বলে জানান ফিলাডেলফিয়া পুলিশের তদন্ত বিভাগের ডেপুটি কমিশনার ফ্র্যাঙ্ক ভ্যানোর।
পাঁচ নারীকে মৃত অবস্থায় দেখা গেছে
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া বিপুল সংখ্যক ছবির মধ্যে ২৭ বছর বয়সী গ্যাব্রিয়েল আমারান্ডো এবং ২৬ বছর বয়সী মারিবেল ফ্রেসেসের ছবিও রয়েছে। দুজনকেই আগে নিখোঁজ হিসেবে রিপোর্ট করা হয়েছিল।
কিছু ছবিতে ওই দুই নারীকে বাড়িটির ভেতরে জীবিত অবস্থায় দেখা যায়। আবার পরবর্তী সময়ের কিছু ছবিতে তাদের মৃত অবস্থায় দেখা গেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। এসব ছবির কিছু ২০১৭ সালের বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া তদন্তকারীরা আরও তিন নারীর ছবি ও ভিডিও পেয়েছেন, যাদের মৃত বলে মনে হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও তৃতীয় নারীর পরিচয় এখনো জানা যায়নি। পুলিশ তাকে ‘জেন ডো’ নামে উল্লেখ করছে।
একটি ভিডিওতে এক নারীকে শ্বাসরোধ করতে দেখা যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই ঘটনায় ইউজিন হর্শের বাবা রেমন্ড ‘আরসি’ হর্শ জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি ওই বাড়িতে থাকতেন এবং গত বছর মারা যান।
পুলিশের ধারণা, রেমন্ড হর্শই এসব ভিডিও তৈরি করতেন। তবে উদ্ধার হওয়া ফুটেজের কতটা বাস্তব অপরাধের দৃশ্য আর কতটা অভিনয়, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ডেপুটি কমিশনার ভ্যানোর বলেন, রেমন্ড হর্শ ভিডিও তৈরি করতেন। তাই ফুটেজের কিছু অংশ অভিনয় হতে পারে, আবার কিছু অংশে সত্যিকারের অপরাধের ঘটনাও থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
নিখোঁজ নারীর সংখ্যা বেড়ে সাত
বৃহস্পতিবার পুলিশ জানায়, বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্যের সঙ্গে এখন পর্যন্ত মোট সাতজন নিখোঁজ নারীর যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন গ্যাব্রিয়েল আমারান্ডো, মারিবেল ফ্রেসেস, শনাক্ত হওয়া আরও দুই নারী, পরিচয় অজানা ‘জেন ডো’, ইউজিন হর্শের গাড়িতে পরিচয়পত্র পাওয়া ব্লেয়ার টনজেল্লি এবং অ্যামি ম্যাকহেল।
তদন্তের বিষয়ে জানতে পেরে ম্যাকহেলের পরিবার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পুলিশ জানিয়েছে, ম্যাকহেল রেমন্ড হর্শকে বিয়ে করেছিলেন। পরে তিনি নিখোঁজ হন।
উদ্ধার হওয়া ছবি ও ভিডিওতে মোট ৫৮ জনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ২৫ জন তদন্তে সহযোগিতা করছেন। আরও ১৬ জনকে পুলিশ খুঁজে বের করলেও তারা তদন্তে সহযোগিতা করছেন না।
ভ্যানোর বলেন, ওই ব্যক্তিরা বাড়িটিতে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন।
তদন্তে এফবিআই, এখনো চার্জশিট হয়নি
ফিলাডেলফিয়া পুলিশের সঙ্গে মিলে তদন্তে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। উদ্ধার হওয়া বিপুল ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের কাজ চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত এসব তথ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তবে ইউজিন হর্শ নিখোঁজ নারীদের সঙ্গে বা উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল তথ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নারীদের নিখোঁজ হওয়া বা সম্ভাব্য হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। বর্তমানে তিনি ফেডারেল হেফাজতে রয়েছেন এবং অস্ত্র ও মাদক-সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি। এসব অভিযোগে তিনি এখনো আদালতে নিজের বক্তব্য দেননি।
তদন্তকারীরা বলছেন, উদ্ধার হওয়া ভিডিও ও ছবির সত্যতা যাচাই এবং নিখোঁজ নারীদের বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।