ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮১টি সামরিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এসব উড়োজাহাজের মধ্যে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও চালকবিহীন ড্রোন রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও হারানো সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে ব্যয় হতে পারে সর্বোচ্চ ৩৩০ কোটি ডলার। এই ক্ষয়ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানবহর এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এসব ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও আকাশপথে পরিচালিত অভিযানে ব্যবহৃত উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে তালিকাভুক্ত ৮১টি উড়োজাহাজের সব কটিই স্থায়ীভাবে ধ্বংস হয়েছে, এমন নয়। এই সংখ্যার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এবং হারিয়ে যাওয়া—দুই ধরনের উড়োজাহাজই রয়েছে। কিছু উড়োজাহাজ মেরামত করে আবারও ব্যবহারের উপযোগী করা সম্ভব হতে পারে। তাই এই সংখ্যাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া সামরিক উড়োজাহাজের হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
ক্ষতিগ্রস্ত ও হারানো উড়োজাহাজের তালিকায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। এ ধরনের ৪৫টি ড্রোনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানে এসব ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতগুলো ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি সক্ষমতা এবং ড্রোনের সরবরাহ বজায় রাখার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ও হারানো উড়োজাহাজের তালিকায় রয়েছে ১২টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান, একটি এফ-৩৫এ লাইটনিং টু যুদ্ধবিমান, দুটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট টু এবং সাতটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ। একটি ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি উড়োজাহাজ এবং সাতটি হেলিকপ্টারের ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও তালিকায় রয়েছে।
এসব উড়োজাহাজের ভূমিকা একেক রকম। এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান আকাশ ও স্থলভাগে সামরিক অভিযান পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। এফ-৩৫এ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধবিমান, যা আকাশযুদ্ধ ও স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম। অন্যদিকে, কেসি-১৩৫ উড়োজাহাজ আকাশে থাকা যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহ করে। ফলে এসব উড়োজাহাজের ক্ষয়ক্ষতি শুধু সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনাই নয়, বরং সামরিক অভিযানের সহায়ক ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্ষয়ক্ষতির সব ঘটনা সরাসরি ইরানের হামলায় ঘটেছে, এমন নয়। কুয়েতের আকাশে ভুলবশত নিজেদের পক্ষের গুলিতে তিনটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে হামলায়ও কয়েকটি যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ, শত্রুপক্ষের হামলার পাশাপাশি ভুলবশত নিজেদের বাহিনীর হামলা এবং অন্যান্য ঘটনার কারণে উড়োজাহাজ হারানোর ঘটনাও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।
আর্থিক ক্ষতির হিসাবেও রয়েছে পার্থক্য। সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি পূরণে ব্যয় হতে পারে ১৯০ কোটি থেকে ৩৩০ কোটি ডলার। এই হিসাব নির্ভর করছে ক্ষতিগ্রস্ত উড়োজাহাজ মেরামত করা হবে, নাকি নতুন সরঞ্জাম দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে, তার ওপর। তাই ৩৩০ কোটি ডলারকে চূড়ান্ত ব্যয় না ধরে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
যুদ্ধের কারণে সামরিক উড়োজাহাজ হারানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। নতুন যুদ্ধবিমান ও নজরদারি উড়োজাহাজ তৈরি বা কেনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি এসব সরঞ্জাম উৎপাদন, সরবরাহ এবং সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম দ্রুত প্রতিস্থাপন করা না গেলে সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া বিমানবহরের ক্ষয়ক্ষতি যুদ্ধের সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টারের পাশাপাশি সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ এবং অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থার জন্যও অর্থ ব্যয় করতে হয়। নতুন সরঞ্জাম কেনার অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হলে প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
তবে যুদ্ধ চলমান থাকায় ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা ও আর্থিক হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে। সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত না হওয়া এবং কিছু সামরিক তথ্য গোপন রাখার কারণে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। তারপরও অন্তত ৮১টি সামরিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা হারানোর হিসাব ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।