প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। নতুন আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৭ সালের শীত পর্যন্ত এই প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থায় থাকতে পারে। চলমান এল নিনো অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৭০ শতাংশ। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হয়। ফলে বিশ্বের এক অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, অন্য অঞ্চলে দেখা দিতে পারে খরা ও তাপপ্রবাহ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু এলাকায় তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে এই উষ্ণতা আরও বাড়তে পারে এবং ডিসেম্বরের দিকে এল নিনো সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের ৮ অক্টোবরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়কালে অতীতের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৮৩ শতাংশ। নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসের হিসাবে সেই সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ। ফলে চলতি এল নিনো ১৯৫০ সালের পর পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
তবে এল নিনো শক্তিশালী হলেই পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই ধরনের আবহাওয়া দেখা দেবে, এমন নয়। এর প্রভাব নির্ভর করে অঞ্চলভেদে বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতির ওপর। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা বাড়তে পারে, আবার কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় এবারের শীত নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাজ্যটির বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষ করে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি—এই তিন মাসেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে বৃষ্টিপাত সবচেয়ে বেশি হতে পারে। কোনো কোনো মাসে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রচুর বৃষ্টিপাত হলে খরা মোকাবিলায় কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। তবে একই সঙ্গে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি এলাকায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়বে। বিশেষ করে অল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢাল, সড়ক এবং নিচু এলাকার বসতিগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উপকূলীয় এলাকায় উঁচু জোয়ার ও শক্তিশালী ঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টি মিলিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন, পানির সরবরাহ, বিদ্যুতের চাহিদা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবহার বাড়তে পারে, আবার অতিবৃষ্টির কারণে কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কোন অঞ্চলে কী ধরনের প্রভাব কতটা তীব্র হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতার প্রবণতা যুক্ত হলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শুধু এল নিনোর শক্তি নয়, সামগ্রিক জলবায়ু পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য বন্যা ও ঝড়ের ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, এবারের এল নিনো অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে—এমন সম্ভাবনা সামনে আসায় বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে সতর্কতা বাড়ছে। তবে শক্তিশালী এল নিনো মানেই সর্বত্র রেকর্ডভাঙা শীত বা ভয়াবহ বন্যা হবে, এমন নয়। অঞ্চলভিত্তিক পূর্বাভাস ও পরবর্তী পর্যবেক্ষণই শেষ পর্যন্ত এর প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দেবে।