ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে নির্মিত বিশ্বের বৃহত্তম বন্যপ্রাণী পারাপার সেতু বন্য প্রাণীদের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা জানতে নতুন প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্যামেরা এবং প্রাণীদের চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, প্রাণীরা এই সেতু ব্যবহার করছে কি না, কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করছে এবং নতুন পথটি তাদের স্বাভাবিক আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন আনছে।
লস এঞ্জেলেসের উত্তর-পশ্চিমে আগুরা হিলস এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ১০১ নম্বর মহাসড়কের ওপর নির্মিত হচ্ছে ওয়ালিস অ্যানেনবার্গ ওয়াইল্ডলাইফ ক্রসিং। ব্যস্ত এই মহাসড়ক সান্তা মনিকা পর্বতমালার প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে বিভক্ত করে রেখেছে। ফলে পাহাড়ি সিংহ, ববক্যাট, কোয়োট, হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। রাস্তা পার হতে গিয়ে অনেক প্রাণী গাড়ির ধাক্কায় মারা যায়। আবার মহাসড়কের কারণে প্রাণীদের বিচরণক্ষেত্র আলাদা হয়ে যাওয়ায় তাদের প্রজনন ও জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যা সমাধানেই তৈরি করা হচ্ছে বিশাল সবুজ সেতুটি। এর ওপর স্থানীয় উদ্ভিদ লাগানো হচ্ছে, যাতে প্রাণীরা কংক্রিটের কাঠামোর পরিবর্তে প্রাকৃতিক পরিবেশের মতো একটি পথ পায়। সেতুটির নকশায় এমন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে যানবাহনের শব্দ ও আলো প্রাণীদের চলাচলে যতটা সম্ভব কম বাধা সৃষ্টি করে।
তবে একটি সেতু নির্মাণ করলেই যে বন্য প্রাণীরা সেটি ব্যবহার করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। প্রাণীরা নতুন কাঠামোটি নিরাপদ মনে করছে কি না, মানুষের উপস্থিতি বা যানবাহনের শব্দে ভয় পাচ্ছে কি না এবং কোন প্রজাতি কীভাবে সেতুটি ব্যবহার করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
এখানেই নতুন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যবেক্ষণ ক্যামেরা ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতির সাহায্যে প্রাণীদের চলাচলের সময়, দিক এবং আচরণ নথিবদ্ধ করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুলসংখ্যক ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে কোন প্রাণী কখন সেতু ব্যবহার করছে, তা শনাক্ত করতে পারে। এসব তথ্য তুলনা করে গবেষকেরা বুঝতে পারবেন, কোন প্রজাতি সহজে সেতুটি ব্যবহার করছে এবং কোন প্রাণী এখনো সতর্ক থাকছে বা এড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রাণীদের অনুভূতি সরাসরি জানা অবশ্য সহজ নয়। তারা সেতুটিকে পছন্দ করছে কি না, তা অনুমানের বদলে তাদের আচরণ, চলাচল এবং পরিবেশের প্রতি প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেই মূল্যায়ন করতে হবে।
এর আগে হরিণ ও এলকের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, গাড়ির শব্দে ভয় পেয়ে সতর্ক হয়ে ওঠা প্রাণীরা বন্যপ্রাণী পারাপারের পথ ব্যবহারে কম আগ্রহ দেখাতে পারে। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু নিরাপদ পথ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রাণীরা সেটিকে নিরাপদ মনে করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়ালিস অ্যানেনবার্গ ওয়াইল্ডলাইফ ক্রসিংয়ের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে অন্যান্য এলাকায় বন্যপ্রাণী পারাপারের সেতু ও সুড়ঙ্গ নির্মাণের পরিকল্পনায় কাজে লাগতে পারে। সঠিক নকশা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রাণীদের আচরণ সম্পর্কে উন্নত ধারণা থাকলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণীর মৃত্যু কমানো এবং বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক আবাসস্থলের মধ্যে সংযোগ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
পরিশেষে, এই প্রকল্পের সাফল্য শুধু সেতুটি কত বড় বা আধুনিক, তার ওপর নির্ভর করবে না। প্রাণীরা নিয়মিত এটি ব্যবহার করছে কি না, তাদের চলাচল নিরাপদ হচ্ছে কি না এবং বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে কি না—এসব ফলাফলই নির্ধারণ করবে প্রকল্পটি কতটা কার্যকর। নতুন প্রযুক্তি সেই সাফল্য পরিমাপের সুযোগ তৈরি করছে।