যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারতের বৃহৎ তেল শোধনাগারগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এড়িয়ে গুজরাটের জামনগরে গেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সেখানে তিনি এশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল তেল শোধনাগার পরিদর্শন করেছেন। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পরিশোধনে ভারতের সক্ষমতা কাজে লাগানো, জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো এবং দুই দেশের মধ্যে আটকে থাকা বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নেওয়া।
রুবিওর এই সফরের সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তার আগে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বড় তেল শোধনাগার স্থাপনের সুযোগও সীমিত। ফলে ভারতের মতো বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিশোধনে সক্ষম দেশের গুরুত্ব বেড়েছে।
জামনগরে রিলায়েন্সের শোধনাগার কমপ্লেক্স প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানে অবস্থিত তেল শোধনাগার কমপ্লেক্স। এখানে বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার ভারী ও ঘন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পরিকল্পনায় প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব বেড়েছে।
মুম্বাইয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রুবিও ভারতকে ‘তেল পরিশোধনের পরাশক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, রিলায়েন্সের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার আরও বেশি অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলার তেলের উৎপাদন বাড়লে তা বিশ্ববাজারে সরবরাহের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
রিলায়েন্স একসময় ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়। চলতি বছর ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আসার পর ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি আবারও দেশটির তেল আমদানি বাড়িয়েছে। ওয়াশিংটন এখন এই বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। তবে রুবিওর সফরের পর রিলায়েন্স ভেনেজুয়েলার তেল কেনা বা পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে কোনো নতুন চুক্তির ঘোষণা দেয়নি।
সফরটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাশিয়ার তেল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর ভারত মস্কোর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনতে শুরু করে। তুলনামূলক কম দামে তেল পাওয়ায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় এই আমদানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছে।
২০২৫ সালের আগস্টে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এতে অনেক ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট শুল্কের হার বেড়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছায়। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়। সম্প্রতি রাশিয়ার তেল কেনার কারণে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন কিছুটা নমনীয় হয়েছে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ভারত স্পষ্ট করে বলেছে, দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। রাশিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি বাড়ানো ভারতের সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ভারত যেন রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর জ্বালানি কেনা বাড়ায়।
রুবিওর সফরে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে। গত মার্চে ট্রাম্প টেক্সাসের ব্রাউনসভিল বন্দরে একটি বড় শোধনাগার প্রকল্পের ঘোষণা দেন। তাঁর দাবি, প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বড় নতুন তেল শোধনাগার। প্রকল্পটির সঙ্গে রিলায়েন্সের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সম্পর্ক রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো এ বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা দেয়নি।
এদিকে, রুবিওর নয়াদিল্লি সফর না করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও রাশিয়ার তেল নিয়ে চাপের কারণে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, নয়াদিল্লিতে দুই দেশের মতপার্থক্য বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত মীরা শঙ্করের মতে, সফরটি মূলত জ্বালানিকেন্দ্রিক হওয়ায় মুম্বাইয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেই রুবিও তাঁর কূটনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করতে পেরেছেন।
মুম্বাইয়ের বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশই দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়লেই দ্রুত চুক্তি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, রুবিওর জামনগর সফর যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ককে আবার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু রাশিয়ার তেল, শুল্কনীতি এবং নতুন জ্বালানি চুক্তি নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য কতটা কমবে, তা এখনো অনিশ্চিত। আপাতত জামনগরের বিশাল শোধনাগার যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কৌশল ও দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।