আটলান্টিক মহাসাগরে এবার হারিকেন মৌসুম যেন অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। মৌসুমের স্বাভাবিক চূড়ার সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত একটি হারিকেনও তৈরি হয়নি। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে শক্তিশালী ‘এল নিনো’কে, যা ঝড় তৈরি হওয়ার আগেই তা দুর্বল করে দিচ্ছে।
ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত আটলান্টিকে কোনো হারিকেন তৈরি হয়নি। আগামী অন্তত এক সপ্তাহেও হারিকেন তৈরির সম্ভাবনা কম। এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি তুলনামূলক দুর্বল ও স্বল্পস্থায়ী ক্রান্তীয় ঝড় তৈরি হয়েছে।
সরকারের ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টারের আবহাওয়াবিদ নিক নভেলা জানান, শনিবার ২০২৬ সাল স্যাটেলাইট যুগে এমন একটি রেকর্ড তৈরি করেছে, যখন মৌসুম শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ঝড় হারিকেনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। হারিকেন হতে হলে ঝড়ের বাতাসের গতি ঘণ্টায় অন্তত ৭৪ মাইল বা ১১৯ কিলোমিটার হতে হয়।
কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির হারিকেন বিশেষজ্ঞ ফিল ক্লটজবাখ জানান, ঝড়ের সংখ্যা, শক্তি ও স্থায়িত্ব—সবকিছু বিবেচনায় আটলান্টিকে সামগ্রিক ঝড়ের কার্যক্রমও ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে কম। বছরের এই সময়ের স্বাভাবিক ঝড়ের কার্যক্রমের মাত্র ৭ শতাংশ দেখা যাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি শান্ত দেখে প্রস্তুতি কমিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ এল নিনোর সময়ও একটি শক্তিশালী ঝড় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে। ১৯৯২ সালের উদাহরণ দিয়ে তারা জানান, ওই বছর হারিকেন মৌসুম দেরিতে শুরু হলেও পরে ভয়াবহ হারিকেন অ্যান্ড্রু ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল।
এল নিনো কীভাবে ঝড় দুর্বল করছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর কারণে আটলান্টিকে এমন কিছু পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা ক্রান্তীয় ঝড়ের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল।
আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টেন করবোসিয়েরো বলেন, বর্তমানে আটলান্টিকে ঝড় তৈরির পরিবেশ এতটাই প্রতিকূল যে কোনো ঝড় তৈরি হওয়ার চেষ্টা করলেই একসঙ্গে কয়েকটি বাধার মুখে পড়ছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহের পার্থক্য বা উইন্ড শিয়ার। নিচের স্তরে একদিকে এবং ওপরের স্তরে বিপরীত দিকে শক্তিশালী বাতাস বইলে ঝড়ের কাঠামো ভেঙে যায়। এল নিনোর কারণে এবার এই উইন্ড শিয়ার রেকর্ড মাত্রায় শক্তিশালী হয়েছে।
আফ্রিকা থেকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মধ্যবর্তী এলাকায়, যেখানে সাধারণত শক্তিশালী হারিকেনের জন্ম হয়, সেখানে উইন্ড শিয়ার স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪৫ মাইল বা ৭৪ কিলোমিটার বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার উইন্ড শিয়ার ঝড়কে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগই দিচ্ছে না।
মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের হারিকেন বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ম্যাকনোল্ডি বলেন, ঝড়ের শক্তি বাড়ার আগেই এর মূল কাঠামো ভেঙে যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি শুষ্ক বাতাস ঝড়ের আর্দ্রতা কমিয়ে দিচ্ছে। আফ্রিকা থেকে আসা ধুলাও ঝড়ের বিকাশে বাধা দিচ্ছে। ঝড় তৈরির সম্ভাব্য প্রাথমিক ব্যবস্থাও এবার কম দেখা যাচ্ছে। আটলান্টিকে উচ্চচাপের কারণে বাতাস নিচের দিকে নামছে, যা ঝড় তৈরির জন্য আরও প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
মেক্সিকো উপসাগর নিয়ে সতর্কতা
তবে মেক্সিকো উপসাগর নিয়ে এখনো সতর্ক থাকতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সেখানে উইন্ড শিয়ার তুলনামূলক কম এবং মৌসুমের শেষ দিকে ওই অঞ্চলে ঝড় শক্তিশালী হওয়ার প্রবণতা থাকে। ফলে আগামী দিনে মেক্সিকো উপসাগরে শক্তিশালী ঝড় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে সমুদ্রের পানি রেকর্ড উষ্ণ থাকা সত্ত্বেও আটলান্টিকে ঝড় কম তৈরি হচ্ছে। গত ১০০ দিন ধরে বিশ্বের মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রা রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণত উষ্ণ সমুদ্রের পানি হারিকেনকে শক্তি জোগায়।
তবে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির আবহাওয়াবিদ কেরি ইমানুয়েলের গবেষণা বলছে, শুধু সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা নয়, সমুদ্রের পানি ও ওপরের বায়ুর তাপমাত্রার পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এল নিনোর কারণে বায়ুমণ্ডল দ্রুত উষ্ণ হলেও আটলান্টিকের পানি একই গতিতে উষ্ণ হয়নি। ফলে শক্তিশালী ঝড় তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না।
ইমানুয়েলের মতে, আটলান্টিকের সমুদ্রপানি বায়ুমণ্ডলের তুলনায় কয়েক মাস পিছিয়ে এল নিনোর প্রভাব অনুভব করছে। তবে আগামী বছর এল নিনো দুর্বল হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে ফিরলে সমুদ্রের উষ্ণ পানি থেকে যেতে পারে। এতে পরের হারিকেন মৌসুম তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরে ঠিক উল্টো চিত্র
এল নিনো সাধারণত আটলান্টিকে হারিকেনের কার্যক্রম কমিয়ে দিলেও প্রশান্ত মহাসাগরে এর প্রভাব প্রায় উল্টো। সেখানে আর্দ্র বাতাস ও কম উইন্ড শিয়ারের কারণে ক্রান্তীয় ঝড় দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে।
চলতি বছর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড়ের কার্যক্রম স্বাভাবিকের প্রায় দ্বিগুণ। সেখানে হারিকেনগুলোও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় ধরে স্থায়ী হচ্ছে। মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড়ের কার্যক্রম স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
ক্লটজবাখ বলেন, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একের পর এক ঝড় তৈরি হচ্ছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত সেখানে ১৬টি নাম দেওয়া ঝড় তৈরি হয়েছে। মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে হয়েছে ২০টি। বিপরীতে আটলান্টিকে হয়েছে মাত্র পাঁচটি ছোট ক্রান্তীয় ঝড়।
এল নিনোর কারণে ঝড়গুলো স্বাভাবিকের তুলনায় আরও পশ্চিম দিকে সরে যেতে পারে। এরই মধ্যে হাওয়াইয়ে দুইবার ঝড়ের প্রভাব পড়েছে।
এল নিনোর এই প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন। তাই কয়েক মাস আগেই আবহাওয়াবিদরা চলতি বছর আটলান্টিকে তুলনামূলক ধীর হারিকেন মৌসুমের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
তবে বিশেষজ্ঞ ম্যাকনোল্ডি বলেন, পরিস্থিতি এতটা শান্ত থাকবে—এটা কেউই সম্ভবত আগে থেকে ধারণা করতে পারেননি। এবারের পরিস্থিতি সত্যিই ব্যতিক্রমী।