উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষা পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন ভূকম্পবিজ্ঞানী (সিসমোলজিস্ট) চেন ইউলিনকে প্রায় দুই বছর ধরে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক করে রেখেছে চীন। এমন দাবি করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
৫৪ বছর বয়সী চেন ইউলিন ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে বেইজিং গেলে তাকে আটক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জিম্মি-অধিকার সংগঠন গ্লোবাল রিচ জানিয়েছে, দীর্ঘদিনেও মুক্তির কোনো লক্ষণ না দেখায় পরিবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চেনের স্ত্রী রং ইউফাং, যিনি নিজেও একজন ভূকম্পবিজ্ঞানী, বলেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে চীনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তাঁর গবেষণার স্বচ্ছ ও সহযোগিতামূলক চরিত্রের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।
চেনের গবেষণার মূল বিষয় ছিল উত্তর কোরিয়ার ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষাগুলো শনাক্ত করা এবং সেগুলোর বিশ্লেষণ করা। তবে তাঁর গবেষণার সঙ্গে চীনের পারমাণবিক কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, চীন গোপনে নতুন পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলছে এবং কিছু গোপন পরীক্ষা চালিয়েছে। যদিও বেইজিং এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
মঙ্গলবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, "চীনের বিচার বিভাগ আইন অনুযায়ী মামলাগুলো পরিচালনা করে। এখানে তথাকথিত অন্যায়ভাবে আটকের কোনো বিষয় নেই।"
চীনের আইনে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
চেনের স্ত্রী জানান, গত ৬০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। তাঁর স্বামীর শারীরিক অবস্থা নিয়েও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চীনা কর্তৃপক্ষ চেনকে ১০০ বারের বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আটক হওয়ার পর প্রথম ১৩ মাস তাঁকে কোনো আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করারও সুযোগ দেওয়া হয়নি।
চীনে জন্ম নেওয়া চেন ইউলিন ২০১১ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর স্থায়ী বাসস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টনে।
তিনি ভূকম্পনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পারমাণবিক বিস্ফোরণ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে তিনি একাধিক গবেষণা প্রকল্পেও কাজ করেছেন। তাঁর স্ত্রী দাবি করেন, চীনের গবেষকদের সঙ্গে সব ধরনের গবেষণাই তিনি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন।
২০২০ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি গবেষণায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে চীনের, ভূকম্পনের তথ্য ব্যবহার করে পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্ত করার পদ্ধতি আরও উন্নত করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল।
গ্লোবাল রিচের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কিছু মহলের সন্দেহ—চীন আন্তর্জাতিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তি লঙ্ঘন করে গোপন পরীক্ষা চালানোর কারণে চেনকে আটক করেছে। তাদের মতে, চেনের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্ত করার প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য জানার সুযোগ পেতে পারে চীন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফোলি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, চেন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের রোগী। কারাগারে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কি বলেন, চেনের প্রতি চীনের এই আচরণ দুই দেশের একাডেমিক সহযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ভবিষ্যতে অন্য গবেষকদেরও চীনের সঙ্গে কাজ করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। তিনি দ্রুত চেন ইউলিনকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, চেনের আটকের তথ্য প্রকাশের এক মাস আগেই চীন নিশ্চিত করে যে তারা মিয়ানমারবিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও মার্কিন গবেষক মিন জিনকেও গুপ্তচরবৃত্তি এবং চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
এলএবাংলাটাইমস/ওএম