মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; মার্কিন সাম্রাজ্য; মার্কিন মুলুক ইত্যাদি নানা নামে ডাকা হয় দেশটিকে। শাব্দিক এসকল নামকরণে, শব্দচয়নে বুঝানোর চেষ্টা করা হয় দেশটির প্রবল ক্ষমতা আর দাপট। পুরো বিশ্ব জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা দেশটির প্রেসিডেন্টের এতোটাই প্রভাব যে, অনেকেই নিজের দেশের রাষ্ট্রপতির নাম না জানলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টর নাম ঠিকই জানেন। গণমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সবসময় লো এঙ্গেলে ক্যামেরা ধরা হয়। যাতে করে ভিজুয়ালি তার ক্ষমতা বা প্রভাব ফুটে উঠে। তাকে দেখতে ক্ষমতাশালী মনে হয়। হচ্ছেও তাই।
কিন্তু প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আগে বোঝাই যায় নি, দেশটিতে এতোটা অভ্যন্তরীন সমস্যা রয়েছে। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই শুরু হয় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদির সংকট। এসকল সমস্যা নিয়েই দীর্ঘদিন চলে দেশটির করোনা সংকট। অবশ্য এই সমস্ত সংকট কাটাতে বরাবরের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে ষ্টেট ও সিটি কর্তৃপক্ষ। পুরো করোনা সংকট জুড়ে ষ্টেট গভর্নর ও সিটি মেয়রদের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। করোনার ক্ষয়ক্ষতি আরও অনেক বেশি হতে পারত। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কম হওয়ার পিছনে যত অবদান তা বলতে গেলে পুরোটা ষ্টেট ও সিটি কর্তৃপক্ষের। ট্রাম্প প্রশাসনকে এখানে ব্যর্থই বলা চলে। শুরুর দিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মীদের করা লকডাউন বিরোধী আন্দোলনে কয়েকজন গভর্নর সমর্থন দিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তাদের বুঝতে দেরি হল না যে, ট্রাম্প করোনা নিয়ে, নাগরিকদের জীবন নিয়ে রাজনীতির খেলা খেলতে চাইছে। আর বুঝতে পেরে অনেকেই সড়ে দাঁড়ান ট্রাম্পের এমন কূটকৌশল থেকে।এবার শুরু হয়ে আরেক নতুন রাজনীতি। আর এই রাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে ট্রাম্প নিজে। ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ এর নামে ট্রাম্প যে শেতাঙ্গদের আকৃষ্ট করছিলো, তা অনেক আগে থেকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল বিশেষজ্ঞরা। এবং ট্রাম্পের এমন রাজনৈতিক ধারণাকে অনেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদী বলে উল্লেখ করেন। ভারতেও চলছে এমন রাজনীতি। তাত্ত্বিকদের মতে, রাজনীতির এমন কৌশলে রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দল কোন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে আকৃষ্ট করতে চায়। এবং আকৃষ্ট করেও। আর এই লক্ষে পৌঁছানোর জন্য সে সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে এমন কিছু ডিসকোর্স তৈরি করে দিবে যাতে করে নাগরিক ঐক্য বহুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এতে করে সাময়িক রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল হয় ঠিকই, কিন্তু জাতিগত দিক থেকে রাষ্ট্র অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। এবং এই বিভক্তির কারণে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়। ফলে এক্ষেত্রে দেশটির দাদাগিরি লোপ পায়। কারণ নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা রেখে তো আর কেউ অন্য রাষ্ট্রের উপর আধিপত্য দেখাতে পারে না। কিংবা এমন আধিপত্য কেউ মেনেও নিবে না।
রাষ্ট্র হিসেবে এই ৪০০ বৎসর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। নাগরিকদের পাশাপাশি দেশ হিসেবেও সভ্যতায় তার অবদান বা অর্জন কম নয় নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় দুইটা বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে বিশ্ব। বিস্ময়কর ঘটনা হলেও সত্যি এই দুইটা যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি লাভ হয়। আর তখনকার বৈশ্বিক শক্তিগুলো বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলমান বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক দেশ এই করোনার মধ্যেই দেশটিতে চলমান এই আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছে। আর ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে ১০ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করেছে। মারা গেছে বেশ কয়েকজন। হতাহতের সংখ্যাও কম নয়। ট্রাম্প আপাদমস্তক একজন ব্যবসায়ী। রীতিমত সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু যদি ট্রাম্প যদি ভেবে থাকে ব্যবসায়িক সমীকরণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে, তবে হয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ এই সময়ে দরকার রাজনৈতিক সমাধান। কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান না হলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে পারে। আর তা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিতে পারে। কারণ করোনার কারণে ইতোমধ্যে দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত। আর এসব ভাবনা থেকে বলা-ই যায় যুক্তরাষ্ট্রের এ কেমন পরিণতি!
এলএ বাংলা টাইমস/এমবি