১৯৯১ সালের ৩ মার্চ লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি সড়কে রডনি কিং দুই বন্ধুসহ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বেশি গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন এ অভিযোগে হাইওয়ে পেট্রোল পুলিশ কয়েক মাইল ধাওয়া করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কাছাকাছি সময়ে সেখানে হাজির হন লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের চারজন কর্মকর্তা। রডনি কিং এ সময় কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। এ কারণে পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁর ওপর চড়াও হন। কিংকে কাবু করতে টেসার গান ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বাঁট দিয়ে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। এই নির্যাতনের ঘটনা দূর থেকে ভিডিও করে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দা জর্জ হলিডে। তিনি ভিডিওটি সংবাদমাধ্যমের হাতে তুলে দিলে দুনিয়াজুড়ে হইচই শুরু হয়।
১৯৯২ সালের ২৯ এপ্রিল সূচনা হয়েছিল সেই ভয়ংকর ঘটনার। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সহিংস সামাজিক অসন্তোষ। এর জন্য দায়ী ছিল আদালতের এক বিতর্কিত রায়। জুরি কৃষ্ণাঙ্গ রডনি কিংকে মারধর করা শ্বেতাঙ্গ পুলিশদের খালাস দেন। জুরি সদস্যদের বেশির ভাগ ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। ইতোমধ্যে লস এঞ্জেলেসের পুলিশের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ ছিল। রডনি কিংয়ের ওপর পুলিশের নির্যাতনের ঘটনা নগরের কৃষ্ণাঙ্গরা ভালোভাবে নেয়নি। পরের বছর আদালতের ওই রায়ে তাই ফুঁসে ওঠে তারা। মুহূর্তেই অশান্ত হয়ে পড়ে লস এঞ্জেলেস। বিশাল এই নগরজুড়ে শুরু হয় তাণ্ডব। লুটপাট, ভাংচুর আর রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মানুষ। ভয়াবহ ওই দাঙ্গা চলে টানা ছয় দিন। মারা যায় ৫৫ জন নাগরিক। আর আহত হয় কয়েক হাজার। সেইসাথে ধ্বংস হয় এক হাজার ৫৭৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কোটি কোটি ডলারের সম্পদহানি ঘটে।
সেই লস এঞ্জেলেস এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বর্ণগত সংঘাতের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে দাঙ্গার ক্ষত বহু আগেই সারিয়ে তুলেছে লস এঞ্জেলেস। পরিবর্তন এসেছে রডনি কিংয়ের জীবনেও। তবে জাতিগত সাম্য বা সম্প্রীতির দিক দিয়ে এ নগরের সবকিছুই যে এখন নিখুঁত, তা নয়। কিন্তু নিঃসন্দেহে সেই সময়ের চেয়ে অনেক ভালো। রডনি কিং পেশায় একজন লেখক। সম্প্রতি বের হয়েছে তাঁর নতুন বই দ্য রায়ট উইদিন: মাই জার্নি ফ্রম রেবেলিয়ন টু রিডেম্পশন এ বইটি নিয়ে তিনি কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। কিং বলেন, সেদিন আসলেই কী ঘটেছিল তা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করেছেন এ বইয়ে। রডনি কিং স্বীকার করেন, দুঃস্বপ্ন পেছনে ফেলে এগিয়েছে লস এঞ্জেলেসের সমাজ। পুরোপুরি প্রত্যাশিত মাত্রায় না হলেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে সর্বত্র।
কিং বলেন, পরিবর্তনটা হচ্ছে ধীরে, কিন্তু পরিস্থিতি ভালোর দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। পরিবর্তনটা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য অঞ্চলেও চোখে পড়ে। রডনি কিং দাঙ্গার পর লস এঞ্জেলেসে জাতিগত বিদ্বেষজনিত উত্তেজনা অনেকটাই কমে গেছে। গুরুতর সহিংস অপরাধের ঘটনা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। সেইসাথে সংঘবদ্ধ অপরাধও কমেছে। তাৎপর্যপূর্ণ রূপান্তর ঘটেছে লস এঞ্জেলেস পুলিশ প্রশাসনেরও। ১৯৯২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশের ৬০ ভাগ সদস্যই ছিল শ্বেতাঙ্গ। কিন্তু এখন পুলিশের ৬০ ভাগই কৃষ্ণাঙ্গসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের।
এলএ বাংলা টাইমস/এমবি