লস এঞ্জেলেস

লস এঞ্জেলেসের ইতিহাসে ভয়াবহ যত রায়ট


লস এঞ্জেলস, ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যতম নগরী। ভৌগোলিক ও আর্থনীতিক গুরুত্বের দিক থেকে লস এঞ্জেলেস শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই অন্যতম নয়। সারা বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি রয়েছে এই নগরীর। সারা বিশ্বের প্রযুক্তি পণ্য বা বিনোদনের রাজধানী বলা হয়ে থাকে প্রাচীন এই নগরীকে। আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও ভৌগোলিক অবস্থান লস এঞ্জেলেসকে নান্দনিক শোভায় শোভিত করেছে। কিন্তু ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় এই লস এঞ্জেলেসেরও রয়েছে কালো অধ্যায়। রয়েছে বর্ণবাদ ও রায়টের ইতিহাস। এলএ বাংলা টাইমসের আজকের পর্বে চলুন জেনে নেই লস এঞ্জেলেসের ইতিহাসে ভয়াবহ কিছু রায়ট সম্পর্কে।    


ওয়াটস রায়ট, ১৯৬৫

এই রায়টের সূচনা হয় আফ্রিকান আমেরিকান ও পুলিশের মধ্যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কৃষ্ণাঙ্গদের মার্কিন পুলিশ বা শেতাঙ্গ পুলিশ বর্বরভাবে নির্যাতন করে এই রকম মিথ সবসময়ই ছিল। কিন্তু ১৯৬৫ সালে এই অভিযোগের পরে ক্রমবর্ধমান বর্ণগত উত্তেজনার পড় দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। সেদিন ক্যালিফোর্নিয়ার হাইওয়ের একজন প্যাট্রোল অফিসার বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য মারকেট ফ্রিকে নামের এক কৃষ্ণাঙ্গকে থামালেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, পুলিশ ফ্রাইকে তুলে নিয়ে গেছে। সেইসাথে পুলিশ ঘটনাস্থলে একটি গর্ভবতী মহিলাকে লাথি মারে। ব্যস, সূচনা শুধু এইটুকুই ছিল। এরপরেই শুরু হয়ে যায় ভয়াবহ দাঙ্গা। ইতিহাসে এটি ‘ওয়াটস রায়ট’ নামে পরিচিত।

লস এঞ্জেলেস রায়ট, ১৯৯২

১৯৯১ সালের ৩ মার্চ লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি সড়কে রডনি কিং দুই বন্ধুসহ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বেশি গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন এ অভিযোগে হাইওয়ে পেট্রোল পুলিশ কয়েক মাইল ধাওয়া করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কাছাকাছি সময়ে সেখানে হাজির হন লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের চারজন কর্মকর্তা। রডনি কিং এ সময় কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। এ কারণে পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁর ওপর চড়াও হন। কিংকে কাবু করতে টেসার গান ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বাঁট দিয়ে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। এই নির্যাতনের ঘটনা দূর থেকে ভিডিও করে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দা জর্জ হলিডে। তিনি ভিডিওটি সংবাদমাধ্যমের হাতে তুলে দিলে দুনিয়াজুড়ে হইচই শুরু হয়। 

১৯৯২ সালের ২৯ এপ্রিল সূচনা হয়েছিল সেই ভয়ংকর ঘটনার। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সহিংস সামাজিক অসন্তোষ। এর জন্য দায়ী ছিল আদালতের এক বিতর্কিত রায়। জুরি কৃষ্ণাঙ্গ রডনি কিংকে মারধর করা শ্বেতাঙ্গ পুলিশদের খালাস দেন। জুরি সদস্যদের বেশির ভাগ ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। ইতোমধ্যে লস এঞ্জেলেসের পুলিশের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ ছিল। রডনি কিংয়ের ওপর পুলিশের নির্যাতনের ঘটনা নগরের কৃষ্ণাঙ্গরা ভালোভাবে নেয়নি। পরের বছর আদালতের ওই রায়ে তাই ফুঁসে ওঠে তারা। মুহূর্তেই অশান্ত হয়ে পড়ে লস এঞ্জেলেস। বিশাল এই নগরজুড়ে শুরু হয় তাণ্ডব। লুটপাট, ভাংচুর আর রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মানুষ। ভয়াবহ ওই দাঙ্গা চলে টানা ছয় দিন। মারা যায় ৫৫ জন নাগরিক। আর আহত হয় কয়েক হাজার। সেইসাথে ধ্বংস হয় এক হাজার ৫৭৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কোটি কোটি ডলারের সম্পদহানি ঘটে।

জর্জ ফ্লয়েড, ২০২০

২৫ মে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম শহর মিনিয়াপলিসে পুলিশি হেফাজতে হত্যার শিকার হন জর্জ ফ্লয়েড। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণ করা ১০ মিনিটের ভিডিওতে দেখা গেছে, হাঁটু দিয়ে নিরস্ত্র ফ্লয়েডের গলা চেপে ধরে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে ডেরেক চাওভিন নামের এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্য। এই হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। চলমান এই বিক্ষোভ এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। মিনিয়াপলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে কাউন্সিল ভোটের পর এক বিবৃতিতে বলেন, জর্জ ফ্লয়েডের স্মরণসভায় তার মৃত্যুর জন্য জড়িত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মধ্যেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটিই যথেষ্ট নয়। এজন্য প্রয়োজন নির্বাচিত নেতাদের জবাবদিহি থেকে শুরু করে বিস্তৃত কাঠামোগত সংস্কার। জানা যায়, ২০১৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৪৪ বার মানুষের গলা চেপে ধরে অজ্ঞান করা হয়েছে। অনেক পুলিশ বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, এই সংখ্যা সাধারণত আরও বেশি হবে। পুলিশি হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে উত্তাল বিক্ষোভের মুখে পুলিশ বিভাগ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মিনিয়াপোলিস সিটি কাউন্সিল। আর চলমান এই আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে লস এঞ্জেলেসেও। 

এলএ বাংলা টাইমস/এমবি