দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় এলাকায় সোমবার থেকে কয়েক দিন ধরে ভয়াবহ জোয়ার ও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা রেকর্ডের কাছাকাছি কিংবা অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়াবিদরা। সোমবার সকালে জোয়ারের সময় থেকেই উপকূলের নিচু এলাকাগুলোতে পানি ঢুকতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিউপোর্ট বিচ ও লং বিচসহ বিভিন্ন এলাকার কর্মকর্তারা জরুরি প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, অস্বাভাবিক উচ্চতার জোয়ারে উপকূলের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্লাবিত হতে পারে। সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে সৈকতের বালু সরে যাওয়া এবং উপকূল ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিউপোর্ট বিচ ও লং বিচের কর্মকর্তারা সৈকত রক্ষায় বালুর বাঁধ শক্ত করছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বালুর বস্তা বসাচ্ছেন। বালবোয়া পেনিনসুলা ও লং বিচ পেনিনসুলার মতো এলাকায় বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এসব এলাকার বিভিন্ন স্থানে উঁচু ঢেউ ও জোয়ারের কারণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বন্যাপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের আগেভাগেই সতর্কতা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গাড়ি নিচু স্থান থেকে নিরাপদ ও উঁচু জায়গায় সরিয়ে রাখা এবং বাড়িঘরের প্রবেশপথে বালুর বস্তা দিয়ে সুরক্ষা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পানি জমে থাকা সড়ক দিয়ে গাড়ি চালানো কিংবা সতর্কতামূলক ব্যারিকেড এড়িয়ে চলাচল না করারও নির্দেশনা রয়েছে।
জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অরেঞ্জ ও সান দিয়েগো কাউন্টির উপকূলীয় এলাকায় বন্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব অঞ্চলে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত উপকূলীয় বন্যা সতর্কতা জারি রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জোয়ারের সময় নিচু এলাকার বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। কিছু সড়ক বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে।
অন্যদিকে, লস এঞ্জেলেস, ভেনচুরা, সান্তা বারবারা ও সান লুইস ওবিসপো কাউন্টির উপকূলীয় এলাকায় বন্যা-সংক্রান্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব এলাকার নিচু স্থানে সমুদ্রের পানি ঢুকে পড়ার পাশাপাশি সৈকতের উল্লেখযোগ্য ক্ষয় এবং কিছু স্থাপনার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জোয়ারের সময় সৈকতের পার্কিং এলাকা, হাঁটার পথ, সাইকেল চালানোর পথ ও বন্দরের পাশের চলাচলের স্থানগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
এবারের অস্বাভাবিক সমুদ্র পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সক্রিয় হারিকেন মৌসুম এবং সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া। এর পাশাপাশি চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্যের অবস্থানজনিত জোয়ারের প্রভাবও সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের হিসাবে, লস এঞ্জেলেস, অরেঞ্জ ও সান দিয়েগো কাউন্টির কিছু এলাকায় এ সপ্তাহে সমুদ্রের মোট পানির উচ্চতা নির্ধারিত ভিত্তিমাত্রার চেয়ে আট ফুটেরও বেশি হতে পারে। এখানে ভিত্তিমাত্রা বলতে ১৯৮৩ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে প্রতিদিনের সর্বনিম্ন পানির উচ্চতার গড়কে বোঝানো হয়েছে।
সান দিয়েগোর লা জোলায় সমুদ্রের পানির সর্বোচ্চ রেকর্ড উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ৮১ ফুট। ২০১৫ সালের ২৫ নভেম্বর শক্তিশালী এল নিনোর সময় এই রেকর্ড হয়েছিল। রোববার সেখানে পানির উচ্চতা ৭ দশমিক ৬৬ ফুটে পৌঁছায়।
লস এঞ্জেলেস হারবারেও পুরোনো রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেখানে সমুদ্রের পানির সর্বোচ্চ রেকর্ড উচ্চতা ৭ দশমিক ৯২ ফুট, যা ২০০৫ সালের ১০ জানুয়ারি নথিভুক্ত হয়েছিল। অক্সনার্ডের আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ১ ফুটে পৌঁছাতে পারে। সোমবার ও বুধবার তা প্রায় আট ফুট হতে পারে। রোববার সেখানে প্রাথমিক হিসাবে পানির উচ্চতা ৭ দশমিক ৭১ ফুটে উঠেছিল।
নিউপোর্ট বিচে রোববারই সমুদ্রের পানির উচ্চতা আট ফুটে পৌঁছায়। শহর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এটি শুধু স্বাভাবিক জোয়ারের কারণে প্রত্যাশিত উচ্চতার চেয়ে ১ দশমিক ৮ ফুট বেশি। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সোমবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৩ ফুট হতে পারে। মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে এবং বুধবার সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে তা ৮ দশমিক ৫ ফুটে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, উষ্ণ পানির কারণে সমুদ্রের উচ্চতা স্বাভাবিক জোয়ারের হিসাবের তুলনায় ১ দশমিক ২৫ থেকে ১ দশমিক ৮ ফুট বেশি থাকতে পারে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত কেলভিন তরঙ্গ এবং কয়েক মাস ধরে চলা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহও পানির তাপমাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
সান দিয়েগোর লা জোলার স্ক্রিপস পিয়ারে আগস্টের শুরুতে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা প্রায় ৭৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছেছিল। সেখানে বছরের এই সময়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় প্রায় ৭০ ডিগ্রি। বৃহস্পতিবারও তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৭৩ ডিগ্রি, যেখানে এ সময়ের স্বাভাবিক গড় প্রায় ৬৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে এবং ২০২৭ সালেও উপকূলীয় প্লাবনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। থ্যাংকসগিভিং, বড়দিন ও মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবসের ছুটির সময় অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ার দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় এসব জোয়ার ‘কিং টাইড’ নামে পরিচিত।
চাঁদের কক্ষপথের পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুটি দীর্ঘমেয়াদি চক্রের উচ্চ প্রভাবের সময়ের কাছাকাছি থাকায় এবার এসব জোয়ার আরও চরম হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির গবেষক রেইনহার্ড ফ্লিকের মতে, চাঁদের কক্ষপথের নোড-সংক্রান্ত ১৮ দশমিক ৬ বছরের চক্র এবং পৃথিবীর কাছাকাছি চাঁদের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত ৪ দশমিক ৪ বছরের চক্র জোয়ারের শক্তিকে প্রভাবিত করে।
এই অস্বাভাবিক জোয়ারের সময় যদি শক্তিশালী ঝড়ও আঘাত হানে, তাহলে উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই বাসিন্দাদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে দূরে থাকা এবং সরকারি সতর্কতা অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।