যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খরচ কমানোর লক্ষ্যে কংগ্রেসে পাস হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিদলীয় বিলের অনুমোদন শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল ভবনে বিলটিতে সই করার আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি ঘোষণা দেন যে ভোটার পরিচয়পত্র সংক্রান্ত একটি পৃথক বিল পাস না হওয়া পর্যন্ত তিনি আবাসন বিলটিতে সই করবেন না। যদিও প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই বিরল দ্বিদলীয় সমর্থনে বিলটি পাস হয়েছে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।
‘২১তম শতাব্দীর রোড টু হাউজিং অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত এই বিলের মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির দাম ও আবাসন ব্যয় কমানো এবং নতুন আবাসনের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ২১শ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন নীতিতে কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত উদ্যোগগুলোর একটি। বিলটিতে ৪০টিরও বেশি ধারা রয়েছে, যার মাধ্যমে বাড়ি নির্মাণ সহজ করা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, স্থানীয় সরকারকে আরও ক্ষমতা দেওয়া এবং বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কত সংখ্যক একক-পরিবারের বাড়ি কিনতে পারবে তার সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বুধবার হোয়াইট হাউসে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, আবাসন সংকটের মূল সমাধান সুদের হার কমানোর মধ্যে রয়েছে। তার মতে, সুদের হার কমলে মানুষ সহজে মর্টগেজ ও অন্যান্য ঋণ নিতে পারবে এবং আবাসন বাজারে গতি ফিরবে। তিনি বলেন, “সুদের হার কমিয়ে দিন, তাহলে যত খুশি বাড়ি পাওয়া যাবে।” তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সতর্ক করে বলেছেন, সুদের হার কমানোর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ নামে ভোটার পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত বিল পাস না হওয়া পর্যন্ত আবাসন বিলের সংবাদ সম্মেলন ও সই অনুষ্ঠান বাতিল থাকবে। এই সিদ্ধান্তের কারণে কয়েকজন আইনপ্রণেতা সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েও শেষ পর্যন্ত জানতে পারেন যে অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুন বলেন, এটি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত হলেও তিনি আশা করেন শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প বিলটিতে সই করবেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন, যিনি বিলটির সহ-উদ্যোক্তা, বলেন ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না এবং এটি সাধারণ আমেরিকান পরিবারের আবাসন ব্যয়ের চাপের প্রতি উদাসীনতার পরিচয়।
ট্রাম্প যে ‘সেভ অ্যাক্ট’ পাসের দাবি করছেন, সেখানে ভোট দেওয়ার জন্য নাগরিকত্বের প্রমাণ ও সরকারি পরিচয়পত্র প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বিলটি পাস করানোর মতো পর্যাপ্ত সমর্থন এখনো পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প আপসের সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে বিলটি আটকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
বর্তমানে আবাসন সংকট যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৮৯ শতাংশ মার্কিন ভোটার চান কংগ্রেস আবাসনকে আরও সাশ্রয়ী করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। রিয়েলটর ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে আবাসন ইউনিটের ঘাটতি ছিল ৪০ লাখেরও বেশি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাড়ির গড় মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার ডলার, যা ২০১০ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হার অনেক আমেরিকানের জন্য বাড়ি কেনার স্বপ্নকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিল পাস হলেও রাতারাতি ভাড়া বা বাড়ির দাম কমে যাবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে নতুন আবাসনের সরবরাহ বৃদ্ধি, নির্মাণ প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে এটি যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করতে পারে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম