জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা আইএইএর (আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। তিনি বলেন, পরিদর্শন অবশ্যই হবে এবং খুব শিগগিরই তারিখ, পদ্ধতি ও স্থান নির্ধারণ করা হবে।
জাপানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গ্রোসি জানান, গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কম সমৃদ্ধ করার (ডাউন-ব্লেন্ডিং) কাজ আইএইএর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হবে। তার মতে, চুক্তির ভাষা এ বিষয়ে একেবারে পরিষ্কার এবং আইএইএর ভূমিকা নির্ধারিত রয়েছে।
তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এবং সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি না আসা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনা ও পারমাণবিক উপকরণে প্রবেশাধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের প্রচারণা দিয়ে বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং পরে কুয়েত ও বাহরাইন সফরে যান। সেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো চুক্তি করবে না যা উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে। রুবিও জানান, ইরান যদি বাস্তবসম্মত ও ভালো একটি চুক্তি করতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, চলতি মাস শেষ হওয়ার আগেই সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের আলোচকরা আবারও বৈঠকে বসতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতায় আরও বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে দেবে এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রভাবও দেখা গেছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারের নিচে নেমে আসে, যা ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবার ঘটল।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানে জাতিসংঘের পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। গত সোমবার সুইজারল্যান্ডে ইরানের প্রধান আলোচকের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, ইরান আইএইএ পরিদর্শকদের দেশে ফিরে আসার অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু পরদিন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি এবং গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শকদের প্রবেশের কোনো পরিকল্পনাও নেই।
এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বক্তব্যকে “ভুল ও বিভ্রান্তিকর” বলে মন্তব্য করেন এবং দাবি করেন, তেহরান সম্পূর্ণভাবে পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। এই বিরোধ প্রসঙ্গে গ্রোসি বলেন, “এক পক্ষ বলছে হ্যাঁ, অন্য পক্ষ বলছে না। রাজনৈতিক বক্তব্য বাস্তবতারই অংশ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুই দেশের প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে পারমাণবিক উপকরণ ও স্থাপনাসংক্রান্ত কার্যক্রম আইএইএর তত্ত্বাবধানে থাকবে।”
১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। সেখানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে এবং ন্যূনতম পর্যায়ে আইএইএর তত্ত্বাবধানে স্থাপনাতেই ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা কমানো হবে।
আইএইএর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থার পরিদর্শকদের ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হলেও গত জুনে বোমা হামলার শিকার হওয়া সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে এখনো প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমানে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কতটুকু, তার অবস্থান কোথায় এবং দেশটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করেছে কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারছে না আইএইএ। ধারণা করা হচ্ছে, ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশ ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ টানেলগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে।
আইএইএর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। এটি আরও সমৃদ্ধ করে ৯০ শতাংশে নেওয়া হলে তাত্ত্বিকভাবে প্রায় ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির উপযোগী উপাদান পাওয়া সম্ভব। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ এবং তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তির আওতায় ইরান তার পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করতে এবং আইএইএর কঠোর নজরদারি মেনে নিতে সম্মত হয়েছিল। বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এরপর থেকে ইরানও ধীরে ধীরে চুক্তির বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা অমান্য করতে শুরু করে, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম