আমেরিকা

ইরানে হামলায় যুদ্ধাপরাধের ‘যথেষ্ট ভিত্তি’ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৭৭ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের ‘যথেষ্ট ভিত্তি’ রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি, ফেব্রুয়ারিতে মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামার্দের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে চালানো হামলা ছিল নির্বিচার, যাতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের কাছে দেওয়া এক প্রতিবেদনে ইরানবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান মিশনের তিন বিশেষজ্ঞ এসব তথ্য তুলে ধরেছেন। তারা জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর দিনই দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এতে অন্তত ১৫৬ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২০ জন শিশু। বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়টি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একটি নৌঘাঁটির পাশেই অবস্থিত ছিল। ওই দিন ঘাঁটিতেও হামলা হয়। তবে বিদ্যালয়টি সহজেই শনাক্তযোগ্য ছিল এবং সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতো—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি প্রাথমিক তদন্তে মার্কিন বাহিনীর দায় থাকার ইঙ্গিত এবং সংঘাতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা থাকা পক্ষগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তাদের মতে, বিদ্যালয়টিই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল। এটি ভুলবশত আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি বা পাশের সামরিক স্থাপনায় হামলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে দুবার হামলা চালানো হয়। মিনাবের হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এর আগে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। লামার্দে হামলায় নিহত ২১ একই দিনে ইরানের লামার্দ শহরের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও আবাসিক এলাকায় হামলা চালানো হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তত ২১ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সাতজন শিশু। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানান, হামলায় প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিএসআরএম) ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া টাংস্টেনের ছোট ছোট ধাতব কণা ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও আশপাশের এলাকায় আঘাত হানে। তাদের মতে, ক্রীড়া কমপ্লেক্সটি স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য ছিল এবং এটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতো—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রই সংঘাতে পিএসআরএম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা থাকা একমাত্র পক্ষ—এমন তথ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্র চালিয়ে থাকতে পারে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী লামার্দে হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে। হামলায় পিএসআরএম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রতিবেদনও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। দুটি হামলার ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া এবং বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটিয়ে নির্বিচার হামলা চালানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ করেছে—এমনটি বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। ইরানে বিক্ষোভ দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রতিবেদনে শুধু মার্কিন হামলার বিষয়ই নয়, ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশজুড়ে হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভ দমনে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী নজিরবিহীন মাত্রায় প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করেছে। তাদের দাবি, দেশটির ৩১টি প্রদেশেই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শী, স্বাস্থ্যকর্মী ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ছাদ ও উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালান। এ সময় অনেক বিক্ষোভকারী মাথা, বুক ও চোখে ধাতব ছররার আঘাতে গুরুতর আহত হন। কারও কারও স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্ষোভ দমনের সময় নিরাপত্তা বাহিনী চিকিৎসাকেন্দ্রেও হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। আহত বিক্ষোভকারীদের মারধর ও গ্রেপ্তার করা হয়। পাশাপাশি কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীকেও আটক করা হয়। এর ফলে অনেকে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা নিতে ভয় পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আটক ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের সময় কয়েক হাজার নয়, বরং কয়েক লাখ নয়—দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের অনেকেই নির্যাতন, একাকী বন্দিত্ব এবং আইনজীবীর সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্তত ২৯ জন পুরুষকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ইরান সরকার মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার আরও বাড়িয়েছে। তবে বিক্ষোভ দমনে মোট কতজন নিহত হয়েছেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে অনুসন্ধান মিশন। ইরান সরকার নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার বলে উল্লেখ করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার জোরালো ভিত্তি রয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা সাধারণ পথচারী ছিলেন বলে ইরান সরকার দাবি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তারা ৭ হাজারের বেশি মানুষের নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংগঠনটির দাবি, নিহতদের প্রায় সবাই বিক্ষোভকারী। ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা উপসংহারে বলেছেন, বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। তাদের মতে, এসব ঘটনা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পরিকল্পিত হামলার অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, বেআইনি আটক, শারীরিক স্বাধীনতা থেকে গুরুতর বঞ্চনা, নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত। ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। তারা নিহতদের জন্য ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘দাঙ্গাকারীদের’ দায়ী করেছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধান মিশন সতর্ক করে বলেছে, ইরানের সাধারণ মানুষ একদিকে নিজ দেশের সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান প্রাণঘাতী সংঘাতের মধ্যেও আটকা পড়েছে।