যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এইচ-১বি ভিসার আওতায় নির্দিষ্ট নতুন বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদনের সঙ্গে এক লাখ ডলার পরিশোধের শর্ত আরোপ করেছে তাঁর প্রশাসন। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে ঘোষণায় সই করেন ট্রাম্প। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই বিধিনিষেধ আরও ১২ মাস বাড়ানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য, এই উদ্যোগের লক্ষ্য মার্কিন কর্মীদের চাকরি ও মজুরি সুরক্ষিত রাখা এবং ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার কমানো।
এইচ-১বি ভিসা মূলত এমন বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ দেয়, যাঁদের বিশেষায়িত পেশায় দক্ষতা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ভিসা ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান এই ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার করে তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেয়। এর ফলে যোগ্য মার্কিন কর্মীরা চাকরির সুযোগ হারাতে পারেন এবং নির্দিষ্ট পেশায় বেতনের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। প্রশাসনের দাবি, নতুন আর্থিক শর্তের কারণে নিয়োগদাতাদের খরচ বাড়বে এবং কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রবণতা নিরুৎসাহিত হবে।
তবে নতুন নিয়মকে সব এইচ-১বি আবেদনকারীর জন্য অভিন্ন ভিসা ফি বৃদ্ধি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটের পর জমা দেওয়া নির্দিষ্ট নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে এই অর্থ পরিশোধের শর্ত কার্যকর হয়। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা কর্মীদের নিয়ে করা প্রযোজ্য আবেদনগুলো বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত। আগে ইস্যু করা এইচ-১বি ভিসা এবং কার্যকর হওয়ার সময়ের আগে জমা দেওয়া আবেদন এই শর্তের আওতায় পড়ে না। বিদ্যমান ভিসা নবায়নের ক্ষেত্রেও এই এক লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের শর্ত প্রযোজ্য নয় বলে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ কোনো কর্মী, প্রতিষ্ঠান বা শিল্প খাতের নিয়োগকে জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করলে এবং তা দেশের নিরাপত্তা বা কল্যাণের জন্য হুমকি নয় বলে নির্ধারণ করলে ব্যতিক্রম অনুমোদন করতে পারে। ফলে সব প্রতিষ্ঠান ও সব বিদেশি কর্মীর ক্ষেত্রে একইভাবে নিয়মটি কার্যকর হবে, এমন নয়।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি এবং বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাগুলোতে পড়তে পারে। এক লাখ ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বিদেশ থেকে কর্মী নিয়ে আসে, তাদের নিয়োগ ব্যয় ও কর্মী নির্বাচনের কৌশলে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির সুযোগ পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। নিয়োগদাতারা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধে অনিচ্ছুক হলে কিছু পদে বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কর্মীদের নিয়োগ দিতে পারেন। তবে এই পরিবর্তন সব খাতে একই রকম প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা, কর্মীদের দক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়মের প্রয়োগের ওপর।
২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নতুন ঘোষণায় ট্রাম্প প্রশাসন বিধিনিষেধটি আরও ১২ মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানায়। হোয়াইট হাউসের দাবি, আগের ব্যবস্থার পর বড় তথ্যপ্রযুক্তি ও আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোর এইচ-১বি আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রশাসনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তম তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত নিবন্ধন ৯২ শতাংশ কমেছে। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে এক লাখ ডলারের অর্থপ্রদানের শর্তের পাশাপাশি অন্যান্য নীতিগত পরিবর্তনেরও ভূমিকা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এইচ-১বি ভিসা ব্যবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ বিদেশি কর্মী নিয়োগের খরচ বাড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন শ্রমবাজারে স্থানীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বৃহত্তর নীতির অংশ। তবে এর ফলে মার্কিন কর্মীদের জন্য কতটা নতুন চাকরি তৈরি হবে এবং প্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মীর প্রাপ্যতায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে নীতিটির বাস্তব প্রয়োগ ও শ্রমবাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।