জাপানের ওকিনাওয়া অঞ্চলে এক নারীকে হ ত্যা ও তাঁর মালপত্র লুটের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের এক মেরিন সেনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটিতে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। জাপানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ বছর বয়সী অভিযুক্ত সেনার নাম ডেভিন জ্যাকব ব্যালার্ড। তিনি ওকিনাওয়ার মার্কিন মেরিন কোর এয়ার স্টেশন ফুতেনমায় কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ অক্টোবর ওকিনাওয়ার রাজধানী নাহার একটি হোটেলে ৩৯ বছর বয়সী আনা ইয়াগিকে হ ত্যা করা হয়। এরপর তাঁর ব্যাকপ্যাক ও মানিব্যাগ নিয়ে চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে ব্যালার্ডের বিরুদ্ধে। তদন্তসংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে জাপানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, টেলিফোনের তার দিয়ে শ্বা সরোধ করে ইয়াগিকে হ ত্যার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে এর আগে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যদিকে, জাপানের আসাহি শিম্বুন ও কিয়োদো নিউজ তদন্তকারীদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয় এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন ব্যালার্ড। ফলে তদন্তে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হোটেলের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম। ফুটেজে সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে ওই নারীকে হোটেলে প্রবেশ করতে এবং পরে তাঁকে একা বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে নারীর ব্যক্তিগত মালপত্র ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি জাপানের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি হত্যাকাণ্ডটিকে ‘নিষ্ঠুর ও জঘন্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে তাঁর সরকার। পাশাপাশি মার্কিন সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর মার্কিন মেরিন কোরও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, একজন মেরিন সেনার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে তারা জাপানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছে। একই সঙ্গে নিহত নারীর পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছে তারা।
ওকিনাওয়ায় মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ নতুন নয়। জাপানে অবস্থানরত প্রায় ৫৫ হাজার মার্কিন সামরিক সদস্যের বড় অংশ এই অঞ্চলে অবস্থান করেন। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি এবং সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষের কারণ হয়ে আছে।
১৯৯৫ সালে ১২ বছর বয়সী এক জাপানি কিশোরীকে অপহরণ, মারধর ও ধ র্ষণের ঘটনায় মার্কিন সেনাসদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর ওকিনাওয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। ওই সময় কয়েক দশ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান। ঘটনাটি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এ ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে ওকিনাওয়ায় মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে যৌ ন নি পীড়নের চারটি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছর মার্কিন বিমানবাহিনীর সদস্য ব্রেনন ওয়াশিংটনকে অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়েকে ধ র্ষণ ও অপহরণের দায়ে পাঁচ বছরের কা রাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে মার্কিন মেরিন সেনা ল্যান্স করপোরাল জামেল ক্লেটনও এক নারীকে যৌ ন নি পীড়নের দায়ে সাত বছরের কা রাদণ্ড পান।
ওকিনাওয়ার গভর্নর গেনতা কোজা বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তাঁর প্রশাসন। তাঁর মতে, সর্বশেষ অভিযোগটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে শৃঙ্খলার ঘাটতির বিষয়টি সামনে এনেছে।
এদিকে, নাহা ও টোকিওতে প্রায় ১০০ জন মানুষ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে দোষীর বিচার দাবি করছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এবার যথেষ্ট হয়েছে।’
তবে ব্যালার্ডের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে। জাপানের কর্তৃপক্ষের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।