যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সীমান্তে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন সীমিত করা, অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের উদ্যোগ এবং সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের মতো পদক্ষেপ তাঁর নীতির কেন্দ্রে রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে সীমান্ত বন্ধ করা এবং ব্যাপকভাবে অভিবাসীদের বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। ক্ষমতায় ফিরে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বেশ কিছু উদ্যোগ আদালতের বাধার মুখে পড়েছিল। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে কংগ্রেসের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ পাওয়া এবং সুপ্রিম কোর্টের তুলনামূলক অনুকূল অবস্থানের কারণে তাঁর প্রশাসন আরও বিস্তৃতভাবে এসব নীতি বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কারা বসবাসের সুযোগ পাবেন, তা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। নির্বাচনটি অনেকের কাছে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির ওপর জনসমর্থনের একটি পরীক্ষাও হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর কঠোর অভিবাসন নীতিকে সমর্থন করেন এমন কিছু ভোটারের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, এই অভিযান প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কঠোর হয়ে উঠছে কি না।
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির পাঁচটি উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হলো।
সীমান্তে অভিবাসীদের প্রবেশ ব্যাপকভাবে কমেছে
জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির সময় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অভিবাসীদের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসীদের সঙ্গে মার্কিন সীমান্তরক্ষীদের যোগাযোগ বা আটকের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা মিলিয়ে ৪৫ লাখের বেশি ‘এনকাউন্টার’ নথিভুক্ত হয়। তবে এই সংখ্যা মোট অভিবাসীর সংখ্যা বা পৃথক ব্যক্তির সংখ্যা সরাসরি নির্দেশ করে না।
বাইডেন প্রশাসনের শেষ দিকে আশ্রয়ের আবেদন সীমিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ছাড়া অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের বহিষ্কারের মাধ্যমে মাসিক সীমান্ত পারাপারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর সেই সংখ্যা আরও নিচে নেমে যায়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রথম বছরের শেষ দিকে সীমান্তে আগের মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি আর দেখা যাচ্ছিল না। ২০২৫ সালের নভেম্বরে টেক্সাসের এল পাসো শহরে গিয়ে প্রতিবেদকরা এমন কিছু এলাকা দেখতে পান, যেখানে আগে আশ্রয়প্রত্যাশীদের অস্থায়ী শিবির ছিল। তখন সেসব স্থানে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত ছিল।
সীমান্তে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তে আশ্রয়ের আবেদন কার্যত স্থগিত করার উদ্যোগ, আটক অভিবাসীদের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ছেড়ে দেওয়ার প্রচলন বন্ধ করা, সীমান্তে সেনা মোতায়েন এবং মেক্সিকোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে উত্তরমুখী অভিবাসীদের প্রবাহ কমানো।
১৬ অক্টোবর এক বিবৃতিতে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান মার্কওয়েন মুলিন দাবি করেন, ট্রাম্প মার্কিন জনগণকে নিরাপদ সীমান্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং পরিসংখ্যান প্রমাণ করছে যে তিনি তা বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর ভাষায়, কঠোর আইন প্রয়োগের ফলাফল স্পষ্ট।
সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কাজ দ্রুত হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর প্রায় ৩ হাজার ২১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে বড় দেয়াল নির্মাণ ট্রাম্পের অন্যতম পুরোনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে তিনি ‘বিগ, বিউটিফুল ওয়াল’ নির্মাণের কথা বলেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রকল্পের কাজ আরও গতি পেয়েছে।
ট্রাম্পের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল’ ব্যয়সংক্রান্ত আইনের মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা ও দেয়াল নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ৪৬৫০ কোটি ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার আগে সীমান্তের কাছাকাছি প্রধান দেয়াল ছিল প্রায় ৬৪৪ মাইল বা ১ হাজার ৩৭ কিলোমিটার। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিছুটা দূরে আরও ৭৫ মাইল বা প্রায় ১২১ কিলোমিটার দ্বিতীয় স্তরের দেয়াল ছিল।
এরপর নতুন করে আরও ২৫০ মাইল বা প্রায় ৪০২ কিলোমিটার দেয়াল ও বিভিন্ন ধরনের সীমান্ত প্রতিবন্ধক নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান ও দ্বিতীয় স্তরের দেয়ালের পাশাপাশি জলপথে বাধা এবং অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার শনাক্ত করার প্রযুক্তিও রয়েছে। আরও ১ হাজার ৪৪৩ মাইল বা প্রায় ২ হাজার ৩২২ কিলোমিটার প্রতিবন্ধক নির্মাণের কাজ চলছে বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন দেয়াল নির্মাণ এবং পুরোনো দেয়াল মেরামত বা আধুনিকায়নের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে বাস্তবে কতটা নতুন অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
দেয়াল নির্মাণের ফলে সীমান্ত পারাপার কতটা কমেছে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের অভিবাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যারন রাইখলিন-মেলনিকের মতে, নতুন দেয়াল নির্মাণের কাজ জোরদার হওয়ার পর সীমান্ত পারাপারের সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রমাণ নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিবাসীর সংখ্যা কমার পেছনে দেয়ালের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও কঠোর বার্তার ভূমিকা বেশি হতে পারে।
তবে ট্রাম্প দেয়াল নির্মাণকে তাঁর সফল নীতিগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরছেন। মেক্সিকোই দেয়ালের খরচ দিয়েছে বলেও দাবি করে আসছেন তিনি। ১৭ অক্টোবর কেনটাকিতে এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘দেয়ালের রাজা’। শুল্ক ও অন্যান্য ব্যয়ের মাধ্যমে মেক্সিকোর কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অভিবাসীদের প্রবেশের চিত্র বদলে গেছে। তবে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কার্যকারিতা, কঠোর নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।