ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বিতর্কের মধ্যে প্রথমবারের মতো মঞ্চে উঠেছেন ব্রিটিশ গায়ক এড শিরান। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় কনসার্টের শুরুতেই তিনি সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কথা বলেন এবং স্বীকার করেন, পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে তিনি কিছু ‘ভুল’ করেছেন। এ জন্য ভক্তদের কাছে দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।
কনসার্টে শিরান বলেন, তিনি কখনোই নিজেকে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেখতে চাননি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা তাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মতো একটি জটিল রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যুর মাঝখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। তার ভাষায়, সংগীত ও কনসার্টকে তিনি সবসময় ঐক্যের জায়গা হিসেবে রাখতে চেয়েছেন, বিভেদের জায়গা হিসেবে নয়।
৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের হামাসের হামলাকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেন শিরান। একই সঙ্গে গাজায় চলমান পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর, অযৌক্তিক ও অসম’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। গাজায় বিপুল প্রাণহানি, বিশেষ করে বেসামরিক মানুষ ও শিশুদের মৃত্যুর মাত্রা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে বলেও জানান এই গায়ক।
শিরান বলেন, নিজের ক্যারিয়ারে গান নিয়ে সমালোচনা মোকাবিলা করতে তিনি অভ্যস্ত। কিন্তু গত কয়েক দিনে সমালোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। এ পরিস্থিতিতে তাকে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং সেগুলো নিতে গিয়ে তিনি ভুল করেছেন বলেও স্বীকার করেন।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন পরিস্থিতিতে তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, কনসার্টে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তার অবস্থান কী বোঝায়—এসব প্রশ্নেরও জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন শিরান। তিনি জানান, এতদিন রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা থেকে দূরে থেকেছেন। তবে এটিকে তিনি মানবিক সংকট হিসেবে দেখছেন এবং নিজের অনুভূতি আর গোপন করতে পারছেন না।
গাজা ও পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিরান বলেন, এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কীভাবে কার্যকরভাবে সহায়তা করা যায়, তা তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার জানাশোনা যথেষ্ট নয় এবং এ কারণে তিনি শুনতে ও শিখতে চান।
কনসার্টে আবেগপ্রবণ হয়ে শিরান বলেন, তার অনুষ্ঠান এমন একটি জায়গা থাকবে যেখানে সবাই স্বাগত। ভিন্নমতের মানুষও সেখানে পাশাপাশি থাকতে পারবেন। তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই সফর আদৌ চলবে কি না, এমনকি তিনি সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে চান কি না—তা নিয়েও একসময় অনিশ্চয়তায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ভক্তদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই আবার মঞ্চে ফিরেছেন তিনি।
শিরান আরও বলেন, কোনো শিল্পী বা অনুষ্ঠানে কী বলা যাবে, তা আগে থেকে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দেবে—এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। তার এই মন্তব্যের পর দর্শকদের একাংশ হাততালি দেন।
ম্যাকলমোরকে শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরেই মূলত এই বিতর্কের শুরু। ম্যাকলমোর একটি অনুষ্ঠানে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গাজায় প্রাণহানির ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। ইসরায়েল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
শিরানের ট্যুরের আয়োজক মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ জানিয়েছিল, কিছু ভেন্যু ম্যাকলমোরকে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে আপত্তি জানিয়েছিল। বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামও তার পারফরম্যান্স না হলে কনসার্ট আয়োজন করবে বলে জানানো হয়েছিল। পরে স্টেডিয়ামের মালিক রবার্ট ক্রাফট ম্যাকলমোরকে সেখানে পারফর্ম করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন।
ক্রাফট ম্যাকলমোরের বক্তব্যকে ‘হেট স্পিচ’ হিসেবে সমালোচনা করেন এবং তার বিরুদ্ধে হামাসের কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করে নির্বাচিত তথ্য তুলে ধরার অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে, ট্যুরের কয়েকজন সহযোগী শিল্পী ম্যাকলমোরের প্রতি সংহতি জানিয়ে সফর থেকে সরে দাঁড়ান। তাদের মধ্যে ছিলেন আইরিশ গায়ক অ্যারন রো এবং ডেনিশ সংগীতশিল্পী লুকাস গ্রাহাম ও তার ব্যান্ড বিওগা।
এদিকে শিরানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের বাকি কনসার্টগুলো নিয়ে টিকিট বিক্রিতেও প্রভাব পড়েছে। কিছু টিকিটের দাম কমে ৩২ ডলার পর্যন্ত নেমে এসেছে। কনসার্টের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভও হয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান বড় ধরনের বাধা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়।