সোমবারও বৃষ্টি থাকবে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়, এরপর আবারও বাড়বে তাপমাত্রা
ঝড় র্যাচেলের বিপদ কাটলেও দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন শঙ্কা, সামনে দাবানলের ঝুঁকি বাড়াবে সান্তা আনা বাতাস
ছবিঃ ফাইল ফুটেজ
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় র্যাচেলের প্রভাব অনেকটা কমে এলেও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এখনো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। ঝড়ের প্রভাবে লং বিচে উপকূলীয় বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর কোচেলা উপত্যকায় দেখা দিয়েছে বন্যা ও পাহাড়ি ঢল। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ঝড়ের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি পেরিয়ে গেছে। তবে উপকূলে উচ্চ জোয়ার, ঢেউ ও সাগরের বিপজ্জনক স্রোতের ঝুঁকি এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই সপ্তাহের শেষ দিকে গরম, শুষ্ক বাতাস এবং মৌসুমের প্রথম দিকের সান্তা আনা বাতাস বয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা দাবানলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ মরুভূমি এলাকাগুলোতে জারি করা ঝোড়ো বাতাসের সতর্কতা সোমবার ভোরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সান ডিয়েগো থেকে সান লুইস ওবিসপো পর্যন্ত উপকূলীয় বন্যার সতর্কতা বহাল রয়েছে। সোমবার ও মঙ্গলবার সকালে আরও দুই দফা উচ্চ জোয়ারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব জোয়ারের কারণে উপকূলের কিছু এলাকায় আবারও পানি উঠে আসতে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উচ্চতার জোয়ার সাধারণত সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে হচ্ছে। রাত ১১টা থেকে মধ্যরাতের মধ্যে দ্বিতীয় দফার জোয়ার তুলনামূলক কম উচ্চতার। সপ্তাহান্তে সকালের জোয়ারের কারণে কিছু এলাকায় সামান্য বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে রাতের জোয়ারে একই মাত্রার বন্যা দেখা যায়নি।
লং বিচের কাছাকাছি এলাকায় রোববার সকালের জোয়ারের প্রাথমিক পরিমাপে পানির উচ্চতা প্রায় ৭ দশমিক ৬ ফুট পাওয়া গেছে। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, সোমবার ও মঙ্গলবার সকালের জোয়ারের উচ্চতা প্রায় ৭ দশমিক ৫ ফুট হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে উপকূলের নিচু এলাকাগুলোতে পানি প্রবেশের ঝুঁকি থাকছে।
সান্তা বারবারা ও সান লুইস ওবিসপো কাউন্টির উপকূলীয় বন্যার সতর্কতা সোমবার সকালের উচ্চ জোয়ার পর্যন্ত বহাল থাকার কথা। অন্যদিকে সান ডিয়েগো থেকে ভেনচুরা পর্যন্ত দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকায় সতর্কতা মঙ্গলবার পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, যদিও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলক কম। তবে সমুদ্রসৈকতের বালু ক্ষয়ে যাওয়া এবং সৈকতের পার্কিং এলাকা ও হাঁটার পথ পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপকূলের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপকূলে বড় ঢেউ এবং সাগরের শক্তিশালী বিপরীতমুখী স্রোতও বিপদের কারণ হয়ে রয়েছে। এসব স্রোত সাঁতারুদের গভীর পানির দিকে টেনে নিতে পারে, ফলে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে তীরের কাছাকাছি বড় ঢেউ ছোট নৌকাকে উল্টে দিতে পারে। রোববার সকালে ডকওয়াইলার বিচে এক ব্যক্তির মৃ ত্যু হয়েছে। ঝড়ের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি পানিতে ডুবে গিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ঝড়ের কারণে উপকূলে ক্ষয়ক্ষতি হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কর্মকর্তাদের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। লং বিচ পেনিনসুলায় বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঐতিহাসিক বোর্ডওয়াকের একটি অংশ সাগরের পানিতে ভেসে গেছে। তবে নিউপোর্ট বিচে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বালুর প্রতিরক্ষাবাঁধ শক্তিশালী করতে দিনরাত কাজ করায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও বন্যা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ঝড় র্যাচেল শক্তিশালী হয়ে ওঠার পেছনে সমুদ্রের অস্বাভাবিক উষ্ণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঝড়টি একপর্যায়ে সাফির-সিম্পসন স্কেলে তৃতীয় শ্রেণির হারিকেনে পরিণত হয়েছিল। আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এল নিনোর প্রভাব, এর আগে কয়েক মাস ধরে চলা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন—সব মিলিয়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার জন্য এমন পরিস্থিতি বিরল। ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো অঞ্চলটিতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের জলবায়ুবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সোয়েইন সতর্ক করেছেন, হারিকেন মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই অঞ্চলটিতে আরও একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সম্প্রতি এক অনলাইন আলোচনায় সোয়েইন বলেন, মৌসুমের শেষ দিকে এসে আরেকটি ঝড়ের সম্ভাবনা কমে এলেও সমুদ্রের তাপমাত্রা এত বেশি যে অক্টোবরের শেষ ভাগ, এমনকি নভেম্বরের শুরুর দিকেও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের প্রভাব দেখা যেতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব শুধু ঝড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ায় এবার তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাতসহ একটি ভেজা শীতকাল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও বেড়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার এই সম্ভাবনার পাশাপাশি এখন দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সামনে আরও একটি তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সপ্তাহের শেষ দিকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার আবহাওয়া ঝড়ের পরের পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তাপমাত্রা বাড়বে, বাতাস শুষ্ক হয়ে উঠবে এবং মৌসুমের প্রথম দিকের সান্তা আনা বাতাস বয়ে যেতে পারে।
সান্তা আনা বাতাস সাধারণত শুষ্ক এবং কখনো কখনো বেশ শক্তিশালী হয়। এই বাতাস গাছপালা ও ঝোপঝাড়ের আর্দ্রতা কমিয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ফলে ঝড় ও উপকূলীয় বন্যার আশঙ্কা কমে এলেও নতুন করে দাবানলের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। তাই ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দাদের এখন গরম, শুষ্ক বাতাস ও সম্ভাব্য দাবানলের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন