সোমবারও বৃষ্টি থাকবে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়, এরপর আবারও বাড়বে তাপমাত্রা
খরচ বাড়ছে, লাভ কমছে, তবু ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য ধরে রাখতে লড়ছেন মার্কিন খামারিরা
ছবিঃ ফাইল ফুটেজ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রেখেও বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপে কঠিন সময় পার করছেন দেশটির অনেক গবাদিপশুর খামারি। জ্বালানি, সার, কাঠ, ইস্পাত ও খামারের সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের ব্যয় বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানির সিদ্ধান্ত এবং বাজারে গবাদিপশুর দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা। ফলে ট্রাম্পের নীতির প্রতি সমর্থন দেওয়া অনেক খামারিই এখন অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক আনুগত্যের মধ্যে টানাপোড়েনে পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের খামারি ইয়েভেট ম্যাননের অভিজ্ঞতা এই সংকটের একটি উদাহরণ। চলতি বছরের এপ্রিলে ভয়াবহ দাবানলে তাঁর খামারের প্রায় ১ হাজার ৬০০ একর চারণভূমি পুড়ে যায়। আগুনে প্রায় ১৩ মাইল বেড়াও নষ্ট হয়। ২০০২ সালে কেনা এই খামারে তাঁর প্রায় ৩০০টি গবাদিপশু আগুন থেকে বেঁচে গেলেও সেগুলোর জন্য নতুন করে চারণভূমি ও বেড়ার ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়ে।
কিন্তু বেড়া মেরামতের খরচই তাঁর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ইস্পাতের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ফুট বেড়া নির্মাণে তাঁকে প্রায় ৪ দশমিক ৮৯ ডলার ব্যয় করতে হয়। সব মিলিয়ে বেড়া পুনর্নির্মাণের খরচ ৩ লাখ ডলারের বেশি দাঁড়ায়। এর পাশাপাশি গবাদিপশুর খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য নিয়মিত খরচও চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে।
যুক্তরাষ্ট্রের খামারিদের ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ডিজেল ও সারের দাম বেড়েছে। গবাদিপশু পালন, খাবার পরিবহন, জমি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিযন্ত্র চালাতে এসব উপকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে খামারের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতিও খামারিদের কিছু খরচ বাড়িয়েছে। আমদানি করা ইস্পাত ও অন্যান্য উপকরণের ওপর শুল্ক আরোপের প্রভাব পড়েছে বেড়া, যন্ত্রপাতি, মেরামতের সরঞ্জাম এবং কাঠের দামে। খামারের অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে এসব উপকরণ প্রয়োজন হওয়ায় ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
নেব্রাস্কার আরেক খামারি জিম জেনকিনসও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ডিজেল, সার, কাঠ ও ইস্পাতের দাম বাড়ায় খামার পরিচালনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বাজারে নতুন করে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটিও খামারিদের উদ্বেগের কারণ।
জেনকিনস দীর্ঘদিন ধরে নেব্রাস্কার কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর পরিবার দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ওই অঞ্চলের জমির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু কৃষি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত খামারিদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
খামারিদের অসন্তোষের আরেকটি বড় কারণ হলো বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানি বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন শুল্ক ছাড়ে প্রায় ৬৬ কোটি পাউন্ড বিদেশি গরুর মাংস বাজারে আনার উদ্যোগ নেয়। এর লক্ষ্য ছিল ভোক্তাদের জন্য তুলনামূলক কম দামে মাংস সরবরাহ করা।
তবে এই সিদ্ধান্তে দেশীয় গবাদিপশুর খামারিদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বিদেশি মাংসের সরবরাহ বাড়লে দেশীয় উৎপাদকদের বাজারমূল্য কমে যেতে পারে। বিশেষ করে গবাদিপশু বিক্রির গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে এ ধরনের সিদ্ধান্ত তাঁদের আয় ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মন্টানা অঙ্গরাজ্যের খামারি ব্যারি ম্যাককয়ও বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে গবাদিপশুর দাম কমতে শুরু করেছিল। এরপর বিদেশি গরুর মাংস আমদানির ঘোষণা খামারিদের মধ্যে আরও উদ্বেগ তৈরি করে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে এসেছেন, তাঁদের অনেকের কাছে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়েছে।
এখানে খামারিদের সমস্যাটি দ্বিমুখী। একদিকে জ্বালানি, সার ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় বাড়ছে; অন্যদিকে তাঁদের উৎপাদিত গবাদিপশুর বিক্রয়মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে সাধারণ ক্রেতারাও উচ্চমূল্যের কারণে গরুর মাংস কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে উৎপাদকদের আয় বাড়ানো এবং ভোক্তাদের জন্য দাম কম রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেব্রাস্কা ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজ্যটির বিপুলসংখ্যক ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। গ্রামীণ এলাকার অনেক খামারি তাঁর বাণিজ্যনীতি, রাজনৈতিক অবস্থান এবং রক্ষণশীল মূল্যবোধের কারণে তাঁকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। কিন্তু এখন তাঁদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, প্রশাসনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত তাঁদের ব্যবসার জন্য কতটা সহায়ক হচ্ছে।
ম্যানন অবশ্য রাজনৈতিক বিতর্কে খুব বেশি জড়াতে চান না। তবে তাঁর মতো খামারিদের আর্থিক চাপ এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
নেব্রাস্কায় রিপাবলিকান প্রার্থী পিট রিকেটসের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ড্যান অসবোর্নের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এই পরিস্থিতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষি খাতের অসন্তোষ ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ নির্বাচনী আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অর্থনৈতিক চাপের কারণে কতজন ভোটার তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করবেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এদিকে খামারিদের ব্যয় কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন ও নেব্রাস্কার গভর্নর জিম পিলেন কিছু সহায়তামূলক উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে কৃষিকাজে ব্যবহৃত ডিজেলের ব্যয় কমানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে খামারিদের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধানে এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবাদিপশু পালন খাত শুধু খামারিদের জীবিকার সঙ্গে নয়, দেশটির খাদ্য সরবরাহ ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। উৎপাদন খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মাংসের বাজার ও ভোক্তাদের ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে। আবার আমদানি বাড়িয়ে দাম কমানোর চেষ্টা দেশীয় উৎপাদকদের স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে মার্কিন খামারিদের বর্তমান পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমর্থন অর্থনৈতিক অসন্তোষের মুখে কতটা অটুট থাকবে, তা নির্ভর করছে জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কৃষিপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন