নিজের সাজানো ওভাল অফিসের পরিবর্তন ঠেকাতে নির্বাহী আদেশে সই ট্রাম্পের
ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ বন্দির সাজা কমালেন গভর্নর গ্যাভিন নিউজম
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ বন্দির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউজম। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব বন্দিকে বাকি জীবন কারাগারে কাটাতে হবে। তবে প্যারোল বা শর্তসাপেক্ষ মুক্তির কোনো সুযোগ থাকবে না।
নিউজমের এই সিদ্ধান্তে অঙ্গরাজ্যটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। যদিও ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০০৬ সালের পর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি, তারপরও অঙ্গরাজ্যটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের তালিকা রয়েছে।
এক চিঠিতে নিউজম বলেন, ‘আমরা এখন এসব অপরাধীকে লোকচক্ষুর আড়ালে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করতে দিতে পারি। অন্যদিকে, অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের আমরা চিরকাল স্মরণ ও সম্মান জানাব।’
নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি বন্দিদের সাজা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রায় ৩০ বছরের সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে নিউজম বলেন, সরকার ন্যায়সংগতভাবে কী করতে পারে, তারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি এই পদক্ষেপ নিচ্ছি, কারণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রীয়ভাবে কাউকে হত্যা করা ক্যালিফোর্নিয়ার মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি আমাদের বিচারব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং আমাদের প্রত্যেকের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।’
নিউজমের মতে, ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরো ব্যবস্থাই ব্যর্থ। এই শাস্তি কখনো ন্যায়সংগতভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। বরং বিচারপ্রক্রিয়ার ভুলের কারণে নিরপরাধ ব্যক্তিরাও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই এমন সর্বোচ্চ শাস্তি, যা আইনগতভাবে তিনি দিতে পারেন এবং নৈতিকভাবে অঙ্গরাজ্য প্রয়োগ করতে পারে।
তবে নিউজম স্বীকার করেছেন, তাঁর এই সিদ্ধান্তে অনেক ক্যালিফোর্নিয়াবাসী ক্ষুব্ধ ও আহত হতে পারেন। এ সিদ্ধান্তের দায়ভারও তিনি নিজেই বহন করবেন বলে জানিয়েছেন।
তাঁর ভাষায়, ‘গভর্নর হিসেবে এই সিদ্ধান্ত এবং এর প্রভাবের সম্পূর্ণ দায় আমার। একইভাবে প্রতিটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দায়ও আমার ওপরই বর্তাত।’
ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোর তুলনায় বেশি। ১৯৭৮ সালে ভোটের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালু হওয়ার পর থেকে সেখানে মাত্র ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ২০১৯ সালে নিউজম অঙ্গরাজ্যটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন।
নতুন সিদ্ধান্তটি অনেকটাই প্রতীকী হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে প্রতিবছর আদালতসংক্রান্ত ব্যয় কয়েক মিলিয়ন ডলার কমতে পারে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মামলা, আপিল এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও নাগরিক স্বাধীনতাবিষয়ক অধ্যাপক বার্নার্ড হারকোর্ট বিবিসিকে বলেন, সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের আগে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করার ঘটনা নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের প্রতি জনসমর্থন থাকলেও এ অবস্থান রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি ১৯৮১ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অবস্থানের উদাহরণ তুলে ধরেন। হারকোর্টের মতে, নিউজমও নৈতিক অবস্থান থেকে একই ধরনের বার্তা দিচ্ছেন, যা ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
নিউজমের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে টেনেসিতে একজন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় গুরুতর জটিলতার ঘটনাও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বৃহস্পতিবার ইন্ডিয়ানা, ফ্লোরিডা ও আলাবামায় তিনটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সূচি রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার সুপ্রিম কোর্টের অন্তত সাতজন বিচারকের মধ্যে চারজনকে এই সাজা পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতে হবে বলে জানিয়েছে ক্যালম্যাটার্স।
যেসব বন্দির সাজা পরিবর্তনের আওতায় এসেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৫৩ বছর বয়সী কিথ ডুলিন। ১৯৯৬ সালে দুই নারী যৌনকর্মী ইনেজ এসপিনোজা ও পেগি টাকারকে হত্যার দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আরও চারজনকে গুলি করার অভিযোগও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তবে ডুলিন এখনো নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
দীর্ঘদিন সান কুয়েন্টিন কারাগারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত অংশে ছিলেন ডুলিন। ২০২৫ সালে কারাগারটির সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাঁকে অন্য কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
ডুলিনের মা ডোনা লারসেন বিবিসিকে বলেন, ছেলের সাজা পরিবর্তনের খবরে তাঁর মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। তবে তিনি মনে করেন, অন্তত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কক্ষটি আর পুনর্নির্মাণ করতে হবে না এবং ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের পক্ষ থেকে আর কাউকে হত্যা করতে হবে না।
নিউজমের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ)। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি ডি রোমেরো বলেন, বর্ণবাদী বৈষম্য, বিচারিক ভুল এবং অমানবিকতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থা ন্যায়বিচারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর মতে, নিউজমের এই পদক্ষেপ সাহসী এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান।
তবে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির প্রধান কৌঁসুলি নাথান হকমান বলেছেন, গভর্নরের সাজা পরিবর্তনের সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি বিলুপ্ত করার ক্ষমতা তাঁর একার নেই। এ জন্য অঙ্গরাজ্যের আইনসভা অথবা ভোটারদের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটারদের সামনে দুইবার মৃত্যুদণ্ড বাতিলের প্রস্তাব তোলা হয়েছিল। দুইবারই তাঁরা গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে এই শাস্তি বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ডের সমর্থক। ২০২০ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে তিনি প্রায় দুই দশকের স্থগিতাদেশ তুলে নিয়ে ছয় মাসের মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রীয় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন।
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে আবারও স্থগিতাদেশ কার্যকর হয়। তবে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ট্রাম্প মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। যদিও ওই আদেশের পর এখন পর্যন্ত কোনো কেন্দ্রীয় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি অঙ্গরাজ্যে এখনো মৃত্যুদণ্ড বৈধ। অন্যদিকে ২৩টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে এই শাস্তি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
এদিকে মেয়াদসীমার কারণে নিউজম গভর্নর হিসেবে তাঁর শেষ সময় পার করছেন। আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে। মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাট নেতা জেভিয়ার বেসেরার তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন