লস এঞ্জেলেসে ৪০ হাজার পাউন্ড বিয়ার চুরি, তথ্য দিলে মিলবে ২০ হাজার ডলার পুরস্কার
বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় ৪ জন নিহত, ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগ ইরানের
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আঘাত হেনে চারজন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরান। নিহতদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগ তুলেছে তেহরান। তবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র কখনো হামলা চালায় না বলে দাবি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় কুহেস্তাক শহরে একটি পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ সেখানে আঘাত করে। এতে চারজন নিহত ও অন্তত ৬৭ জন আহত হয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ঘটনাটিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি, ৪৩ বছর বয়সী কোলসুম মাল্লাহী নাজদনিয়া, ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাল্লাহী এবং চার বছর বয়সী আমিরালি কারিমি রয়েছেন। শুরুতে ইরানের রেড ক্রিসেন্টের বরাত দিয়ে পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হলেও পরে নিহতের সংখ্যা চারজন বলে জানানো হয়।
বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত বাড়িটির মালিক ও কনের বাবা আলি মাল্লাহী রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওতে বলেন, এটি একটি আবাসিক ভবন ছিল এবং সেখানে তার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। তিনি বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সৌভাগ্যক্রমে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হয়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সিরিক এলাকায় এই হামলার বিষয়ে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সম্পর্কে তারা অবগত। তবে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।’
ইরানের দাবি, বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার পাশাপাশি দেশটির আরও কয়েকটি এলাকায় মার্কিন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, কেরমানশাহে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশবিষয়ক বাহিনীর চার সদস্য এবং পারস্য উপসাগরের লাবান দ্বীপে বাসিজ বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হয়েছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির যাচাইয়ে দেখা গেছে, কুহেস্তাক উপকূলের কাছে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস হয়েছে। আশপাশে বেশ কয়েকটি বাড়িও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠান চলা বাড়িটি ওই টাওয়ার থেকে প্রায় ১১২ মিটার দূরে ছিল।
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। বুধবার ভোরে আইআরজিসি ও ইরানের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করেছে। এর মধ্যে ১০টি ধ্বংস করা হয় এবং তিনটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, জর্ডানে হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
কুয়েতের দমকল বাহিনী জানিয়েছে, একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে ড্রোন আঘাত হানার পর সেখানে আগুন ধরে যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের সামরিক বাহিনী আরও দাবি করেছে, ইরাকের ইরবিলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, গুদাম ও সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে। তবে ইরাকি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। স্থানীয় গণমাধ্যমে অবশ্য একটি মার্কিন নজরদারি বেলুন ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের দাবি, মার্কিন বাহিনীর নির্দেশনায় একটি ‘অবৈধ পথে’ চলার সময় দুটি তেলবাহী জাহাজ মাইনে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যায়। অন্যদিকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জাহাজ কোম্পানি জানিয়েছে, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ‘সিডর’-এর সঙ্গে একটি নিরাপত্তাজনিত ঘটনায় দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম বলছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সাম্প্রতিক হামলার চেষ্টা এবং মার্কিন বাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুমকির জবাব হিসেবেই ইরানে হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাসের চালান সাধারণত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অপরাধের জন্য অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত’ হামলা চলবে।
এর আগে প্রায় এক মাসের বিরতির পর রোববার ইরানে আবার হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন পেতে ব্যবহার করা হতে পারে—এমন দুটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করতেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। এর জবাবে ইরান জর্ডানের বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি ড্রোন পাঠায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের হামলা শুরু করে। ওই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ইরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর ফলে কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। এতে সব পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য দুই মাস সময় দেওয়ার কথা ছিল। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে যায় এবং আবারও সংঘাত শুরু হয়।
এরপর থেকে অঞ্চলটির বাণিজ্যিক জাহাজগুলোও সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে পড়েছে। ইরান অভিযোগ করছে, অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করছে তারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা করছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ও ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে তারা সামরিক পদক্ষেপের বদলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দিকে বেশি গুরুত্ব দেবে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা ও দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই পদক্ষেপকে আগের মার্কিন অর্থনৈতিক চাপেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন