দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, লস এঞ্জেলেসে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের পথ কঠিন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিপাকে ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীরা
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখছেন এমন লাখো ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আটটি বড় প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ডের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীরা এই সিদ্ধান্তের বড় প্রভাবের মুখে পড়তে পারেন।
গত ৮ অক্টোবর মার্কিন প্রশাসন জানায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন বা পার্ম (PERM) আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াও স্থগিত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে মার্কিন কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার কথিত অপব্যবহার বন্ধ করার যুক্তিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), উইপ্রো, এইচসিএল টেকনোলজিস এবং ক্যাপজেমিনি। এর মধ্যে ভারতের চারটি বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা বহু ভারতীয় কর্মীর স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অভিযোগ, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মীদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য অভিবাসনব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছে। তাঁর দাবি, এ ধরনের চর্চা বন্ধ করে মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ও শিল্প খাতের তথ্য থেকে পরিস্থিতির ভিন্ন দিকও উঠে এসেছে। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির গত অর্থবছরে করা এইচ-১বি ভিসার আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল বিদ্যমান কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা তাঁদের অভিবাসনগত অবস্থার পরিবর্তনের জন্য। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, একই ধরনের কাজ করা কর্মীদের বেতনেও বৈষম্য করা হয় না।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ন্যাসকমের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগে এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হতে পারে। তবে কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ সংকুচিত হলে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা এবং নতুন কর্মী আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বুঝতে হলে এইচ-১বি ভিসা ও গ্রিন কার্ডের মধ্যকার পার্থক্য জানা জরুরি। এইচ-১বি ভিসা বিদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িকভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে, গ্রিন কার্ড দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দেয়।
পার্ম প্রক্রিয়ায় নিয়োগকর্তাকে প্রমাণ করতে হয়, নির্দিষ্ট পদের জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য ও আগ্রহী মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে একই ধরনের কাজে যুক্ত মার্কিন কর্মীদের বেতন বা কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। শ্রম বিভাগের অনুমোদন পাওয়ার পর কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ডের পরবর্তী ধাপে এগোনো যায়।
তবে নতুন স্থগিতাদেশের অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব এইচ-১বি ভিসাধারীর ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। আপাতত নিষেধাজ্ঞাটি পার্ম প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। ফলে যাঁরা ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করছেন, তাঁদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার চেয়ে স্থায়ী বসবাসের আবেদন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বেশি।
ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সমস্যাটি আরও জটিল, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ডের আবেদনের দীর্ঘ জট রয়েছে। ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান পলিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় নাগরিক কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় ছিলেন। এটি ওই সময়ের মোট অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের প্রায় ৭৯ শতাংশ।
দেশভিত্তিক গ্রিন কার্ডের সীমা এবং বিপুল আবেদনসংখ্যার কারণে ভারতীয় আবেদনকারীদের অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। নতুন বিধিনিষেধের ফলে অপেক্ষার সময় আরও বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে স্থগিতাদেশ কত দিন কার্যকর থাকে এবং সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলোর ভবিষ্যৎ কী হয়, তার ওপর।
এই পরিস্থিতিতে কিছু কর্মী অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি খোঁজার কথা ভাবতে পারেন। তবে নতুন নিয়োগকর্তাও তাঁদের গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে আগ্রহী হবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাই, ব্যয় কমানোর চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে নতুন চাকরি পাওয়াও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
কিছু পেশাজীবীর জন্য বিকল্প অভিবাসনপথ রয়েছে। বিশেষ দক্ষতা ও উল্লেখযোগ্য অর্জনসম্পন্ন ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শর্তে নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ ছাড়াই আবেদন করতে পারেন। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে যোগ্য ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির গ্রিন কার্ড পাওয়ার সুযোগও রয়েছে। তবে এসব পথের যোগ্যতা ও আর্থিক শর্ত আলাদা, তাই সবার পক্ষে সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করার পরও স্থায়ী হওয়ার সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে কর্মীদের পারিবারিক জীবন, সন্তানদের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। কেউ কেউ ভারতে ফিরে যাওয়া বা সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বিকল্প কর্মবাজারে যাওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি আরও কঠোর করার ধারার অংশ। এতে মার্কিন কর্মীদের সুরক্ষার কথা বলা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের আকর্ষণ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু চাকরি নয়, বরং বছরের পর বছর কাজ করার পরও যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন কতটা বাস্তব থাকবে, তা নিয়ে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন