আপডেট :

        নিউইয়র্কে পাঁচতলার জানালা থেকে পড়ে দুই বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃ ত্যু

        হার্ভার্ড-এমআইটির শিক্ষার্থী থেকে মেয়র, কে এই নিথিয়া রামন

        কয়েক দশক ধরে গ্যাং সহিংসতা কমাতে কাজ, এবার হ ত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার

        সমুদ্রগর্ভে হারানোর ঝুঁকিতে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার রেলপথ, রক্ষায় বড় উদ্যোগ

        ট্রাম্পের ২৫০ ফুট বিজয়স্তম্ভ নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিলেন মার্কিন বিচারক

        নিজের সাজানো ওভাল অফিসের পরিবর্তন ঠেকাতে নির্বাহী আদেশে সই ট্রাম্পের

        ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ বন্দির সাজা কমালেন গভর্নর গ্যাভিন নিউজম

        লস এঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে কারেন বাসকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন নিত্যা রামন

        ‘শত্রু আর কেউ নয়, আমরাই’, ট্রাম্প শিবিরের ভেতরের ব্যর্থতার চিত্র প্রকাশ্যে

        ৩৩টি গবেষণায় উঠে এল পু রুষাঙ্গের গড় আকার, দৈর্ঘ্য ও পরিধি নিয়ে বাস্তব তথ্য

        নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে আবাসিক ভবনে ভয়াবহ আ গুন, ছয়জনের মৃ ত্যু

        হরমুজ প্রণালিতে আরও তিনটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত, যু দ্ধ বন্ধে ইরানের চাপ অব্যাহত

        ধর্ষণ ও যৌন হা মলার মামলায় দোষী সাব্যস্ত ব্রিটিশ অভিনেতা রাসেল ব্র্যান্ড

        কালো পোশাকে ইনগলউড থেকে নিখোঁজ ১৫ বছরের কিশোর, সন্ধানে জরুরি বার্তা

        ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের সংস্কারকাজে ১৬ মাস বন্ধ থাকবে লস এঞ্জেলেসের গুরুত্বপূর্ণ সেতু

        বিকেলেই অন্ধকার নামায় বিরক্ত ট্রাম্প, সিনেটকে সময় পরিবর্তন বন্ধের আইন পাসের তাগিদ

        টাম্পায় সিটিব্যাংকে গু লি চালিয়ে নারী হ ত্যা, নিরাপত্তাকর্মীর পাল্টা ব্যবস্থায় নি হ ত হামলাকারী

        ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম বন্যপ্রাণী সেতুতে বসছে নজরদারি ক্যামেরা, দেখা যাবে প্রাণীদের চলাচল

        ধনীদের সম্পদের ওপর কর বসানোর উদ্যোগে বিভক্ত ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটার, সামনে এল নানা কারণ

        ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ে চাপে ইলন মাস্ক, ঝুঁকিতে স্পেসএক্স ও টেসলার ভবিষ্যৎ

ডাক্তারদের উপঢৌকন বন্ধ হলে ৩০ শতাংশ কমবে ওষুধের দাম

ডাক্তারদের উপঢৌকন বন্ধ হলে ৩০ শতাংশ কমবে ওষুধের দাম

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। বেলা ১১টা। বহির্বিভাগের ডাক্তারের কক্ষ থেকে কোনো রোগী বের হলেই তাকে ঘিরে ধরছেন বেশ কয়েকজন মানুষ। হুমড়ি খেয়ে তার হাতের প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন তারা।

কথা বলে জানা যায়, তারা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি। ছবি তোলার কারণ, নিজেদের কোম্পানির ওষুধ চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে লিখেছেন কি না, সেটা যাচাই করে দেখা। প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সেই ছবি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও পাঠিয়ে দেন।

কেবল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেই নয়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের কক্ষ থেকে রোগী বের হওয়া মাত্রই প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার দৃশ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আর এর কারণ হিসেবে জানা যায়, নিজেদের কোম্পানির ওষুধ লেখার জন্য ডাক্তারদের কোম্পানির পক্ষ থেকে নিয়মিত দামি দামি উপহার এবং নগদ টাকাও দেওয়া হয়। এ ছাড়াও দেশে-বিদেশে একক বা দলগতভাবে ভ্রমণ কিংবা সেমিনারে অংশগ্রহণের ব্যবস্থাও করে ওষুধ কোম্পানিগুলো।

একটি মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক পর্যায়ের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন অধিকাংশ চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নানারকম সুবিধা নিয়ে থাকেন। এসব নিয়ে আর কী বলব! যারা এমন করছেন তারা আমাদেরই ছাত্র, ভাই-বন্ধু ও সহকর্মী। আবার সৎ ডাক্তার যে একেবারে নেই, তা নয়। কোনো কোম্পানি নগদ খাম দেয়, কেউ দামি উপহার দেয়, কেউ হয়তো ডাক্তারদের পরিবার-পরিজনদের দেশে-বিদেশে ট্যুরের টাকাও দেয়।

তিনি আরও বলেন, এই যে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে এত এত লোকজন লাগিয়ে রেখেছে ওষুধ কোম্পানি, তারা প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে থাকে, কোন ডাক্তার কী ওষুধ লিখছে দেখার জন্য। এসবের তো একটা খরচ আছে। সব খরচ কিন্তু ওষুধের মূল্যের সাথেই যুক্ত হয়ে যায়।

গত কয়েক মাস থেকে দেশে ওষুধের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৯০ শতাংশ। স্বল্প আয়ের মানুষ বাড়তি মূল্যে ওষুধ কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। ওষুধের দাম বৃদ্ধির ফলে জনসাধারণের মনে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকদের মধ্যে চলা প্রমোশনের নামে অনৈতিক লেনদেন। কারণ, ডাক্তারদের দেওয়া টাকা বা উপহার কোনো কোম্পানিই নিজেদের পকেট থেকে দেয় না। ওষুধের দাম বাড়িয়ে সেই টাকা ক্রেতাদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়। ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রমোশন কিংবা মার্কেটিংয়ের নামে ডাক্তারদের যে অনৈতিক সুবিধা দেয়, তা বন্ধ করা গেলে বর্তমান বাজার মূল্যের চেয়ে ওষুধের দাম অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ওষুধের কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচ, লেভেলিং-প্যাকেজিং, প্রোমোশন ও মার্কেটিংসহ ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত কোন পর্যায়ে কত টাকা খরচ হয় জানতে বাংলানিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় ওষুধ শিল্পে ৪২ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এ বি এম জামালুদ্দিনের সঙ্গে। বর্তমানে তিনি গণস্বাস্থ্য বেসিক কেমিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

গণস্বাস্থ্য বেসিক কেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনের আগে এ বি এম জামালুদ্দিন ফাইজারের ম্যানেজার পদে ১৩ বছর, রেনেটায় ১৩ বছর, অ্যাক্টিভ ফাইন ক্যামিক্যালসে ১৫ বছর কাজ করেছেন। এ ছাড়াও ওষুধ তৈরির কাঁচামাল বিষয়ক জাতীয় এপিআই (অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্স) পলিসির স্টেকহোল্ডার হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।

ওষুধের উৎপাদন খরচ প্রসঙ্গে জামালুদ্দিন বলেন, ওষুধের ইন জেনারেল থিউরি হচ্ছে, কস্ট অব গুডস অর্থাৎ উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। মার্কেটিং, প্রোমোশন এবং অন্যান্য খরচ আরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কোম্পানির মুনাফা। এটা বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে, ছোট কোম্পানির মুনাফা আরও বেশি হয়। ডাক্তারদের অনৈতিক সুবিধা না দিলে কোম্পানির মার্কেটিং খরচ ১০ শতাংশে নামিয়া আনা সম্ভব।

প্যারাসিটামল ট্যাবলেট উৎপাদনের খরচ প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রতিটা প্যারাসিটামল ট্যাবলেটে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ পয়সা খরচ হয়। এটা বিক্রি করা হচ্ছে ১.২০ টাকায়, মার্কেটিং খরচ বাদে যা থাকে সেটাই লাভ।

এ বি এম জামালুদ্দিন আরও জানান, ডায়াবেটিস রোগে ব্যবহৃত মেটফরমিন ৫০০ মি.গ্রা. এবং ৮৫০ মি.গ্রা. আকারে বাজারে পাওয়া যায়। মেটফরমিন ৮৫০ মি.গ্রা. প্রতিটির উৎপাদন খরচ হয় ৫৫ পয়সা, এর সাথে এক্সিপিয়েন্ট (সহযোগী উপাদান) যোগ করলে মোট খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ পয়সা। প্যাকেজিংসহ এই ওষুধে মোট প্রায় এক টাকা খরচ হয়। এটা প্রতি পিস বিক্রি হয় ছয় টাকায়। এই ছয় টাকার ১৫ শতাংশ জনগণ ভ্যাট হিসেবে দেয়। বাকি পাঁচ টাকার মধ্যে আবার প্রমোশনাল এবং মার্কেটিং বাবদ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যয় হয়। বাকিটা কোম্পানির লাভ থাকে।

উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত লোসারটান পটাশিয়াম ১০০ মি.গ্রা. প্রতি ট্যাবলেটে উৎপাদন খরচ হয় দশমিক শূন্য ছয় পয়সা। সহযোগী কেমিক্যাল, প্যাকেজিং সব মিলে প্রতি ট্যাবলেটে ১.২৫ টাকার মতো খরচ হয়। এটা কোম্পানি ভেদে বিক্রি করা হয় ১০ থেকে ১২ টাকায়। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মার্কেটিং ও প্রমোশন খরচ।

এ বি এম জামালুদ্দিন বলেন, কোনো ওষুধের গায়ে যদি মূল্য ১০০ টাকা থাকে, সেইখান থেকে সরকার ভ্যাট ১৫ টাকা পায়, ফার্মেসির লাভ থাকে ১৫ টাকা। বাকি ৭০ টাকার মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামালসহ উৎপাদন খরচ, এর সাথে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মার্কেটিং ও প্রোমোশন খরচ, বাকিটা কোম্পানির মুনাফা।

তিনি জানান, ওষুধের দাম বাড়ার একটা বড় কারণ; ডাক্তারদের স্পিড মানি, খাম ও উপহার সামগ্রী দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় কোম্পানির ৩০ শতাংশ ব্যয় হয়ে যায়। ডাক্তারদের যদি এসব না দিতে হতো তাহলে ওষুধের দাম বর্তমান বাজার মূল্যের থেকে ৩০ শতাংশ কম থাকতো।

ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের উপহার দেওয়ায় প্রবণতা বন্ধ হলে ওষুধের দাম কমতে পারে কি না জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার বলেন, প্রমোশনের নামে চিকিৎসকদের বিভিন্ন উপহার, টাকা-পয়সা দেওয়াসহ অনৈতিক সব ব্যয় ওষুধের মূল্যের সাথে যুক্ত হয়। সেই মূল্য ভোক্তাকেই পরিশোধ করতে হয়। কোম্পানি অযৌক্তিক এসব ব্যয় কমালে ওষুধের মূল্য বেশ কমে আসবে।

ওষুধ কোম্পানি এবং ডাক্তারদের অনৈতিক সুবিধা আদান-প্রদান বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, এটাকে আমরা বলি অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং। ওষুধের দাম যদি সরকারের প্রাইসিং ফর্মুলার ভিত্তিতে হয়, তাহলে কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। অতিরিক্ত মূল্য যখন নিতে পারবে না তখন ওষুধ কোম্পানির সারপ্লাস থেকেই অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিংয়ের খরচ বহন করতে হবে। তখন তারা এই অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং থেকে সরে আসবে।

তিনি আরও বলেন, এখন যেহেতু কোম্পানি নিজেরাই দাম নির্ধারণ করে, তাই দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকে ডাক্তারকে ৮ টাকা দিলে তো তাদের ক্ষতি নাই। তারা যেহেতু দাম নির্ধারণ করে তাই তারা এটা করতে পারছে। কিন্তু দাম যখন সরকারের অথরিটি নির্ধারণ করবে, তখন এটা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সমস্ত প্রকার ওষুধের দাম ফর্মুলার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। এজন্য একটা জাতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি তৈরি করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা এবং স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ডাক্তারদের যেমন নৈতিকতা মেনে চিকিৎসাসেবা দেওয়া উচিত ঠিক তেমনি ওষুধ কোম্পানিগুলোকেও নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা করা উচিত। যদি ওষুধ কোম্পানিগুলো নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা করে এবং ডাক্তারদের কোনোরকম অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা না দেয়, তাহলে ওষুধের দাম অবশ্যই কমে আসতে পারে।

এলএবাংলাটাইমস/আইটিএলএস

শেয়ার করুন

পাঠকের মতামত