Updates :

        নিউসামের উপর চড়াও হওয়ার অভিযোগে আটক এক ব্যক্তি

        ক্যালিফোর্নিয়ায় তীব্র তাপদাহ: জরুরি অবস্থা জারি

        কী আছে পুতিনের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বিমানে?

        নেইমারের রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায় কিংবদন্তি পেলে

        একইদিন মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল

        প্রথমবার একসঙ্গে তৌসিফ-ইরফান, মধ্যমণি তানহা

        দ্বিতীয় মেয়াদে জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস

        স্ত্রী হত্যার দায়ে সিলেটের নতুন কারাগারে প্রথম ফাঁসি কার্যকর

        পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত নারীকে ট্রেড কমিশনের চেয়ারপার্সন করলেন বাইডেন

        ইসরায়েলি ড্রোন ভূপাতিত করলো ফিলিস্তিনিরা

        পুলিশ হেফাজতেই থাকছেন ত্ব-হা আদনান

        আবু ত্ব-হা আদনানকে পাওয়া গেছে

        অ্যারিজোনায় বন্দুক হামলায় মৃত ১, আহত ১২

        কাজ না খুঁজলে দেওয়া হবে না কর্মহীন ভাতা: নিউসাম

        তীব্র তাপদাহের কবলে ক্যালিফোর্নিয়া: ফ্লেক্স সতর্কতা জারি

        হলিউডে গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার জোড়া লাশ

        ওবামাকেয়ার সমর্থন করে রায় দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

        লস এঞ্জেলেসে নিষিদ্ধ হচ্ছে সুগন্ধি তামাক বিক্রি

        সম্পর্কের অচলাবস্থা কাটেনি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার

        সিলেটের জকিগঞ্জে নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান

আদৌ কি জলাবদ্ধতা দূর হবে?

আদৌ কি জলাবদ্ধতা দূর হবে?

কি বৈশাখ, কি জৈষ্ঠ কিংবা আষাঢ় জলাবদ্ধতায় ডুবে রাজধানী ঢাকা। আর চট্টগ্রাম নগরীও থাকে পানির তলায়। ভরসা কোথায়? আদৌ কি এই দুই নগরের জলাবদ্ধতা দূর হবে? সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিতে রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ডুবে যায়। নগরজীবন অচল হয়ে পড়ে। জল জটের সাথে নগরীতে আছে যানজটও। রাস্তায় পানিতে ধৈ ধৈ করলেও অনেক ক্ষেত্রেই ঘরে ওয়াসার পানি থাকে না। বিশুদ্ধ পানি সব ধরনের মানবাধিকারের ভিত্তি হিসাবে স্বীকৃত হলেও এই অধিকার বাংলাদেশে লঙ্ঘিত হচ্ছে। একদিকে বিশুদ্ধ পানির সংকট অন্যদিকে জলাবদ্ধতা এভাবে কি নগর জীবন চলে?
‘উচ্ছ্বল সাগরের দোলাতে দোদুল...’, রাজধানীতে সাগরের ঢেউ, অতিবৃষ্টিতে প্লাবিত চট্টগ্রাম, ভারী বৃষ্টিতে  জলমগ্ন : ভোগান্তি। এমনসব শিরোণামের সংবাদ আজ (২ জুন) আমাদের জাতীয় পত্রিকাগুলো ছেপেছে। রাজধানীর বঙ্গভবনের দক্ষিণ গেটের রাস্তায় ৩ ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে সাগরের ঢেউ উপভোগ করেছে রাজধানীবাসী। হাঁটুপানির উপর দিয়ে গাড়ি চলতে হয়েছে। মতিঝিল, আরামবাগ, কমলাপুর, শান্তিনগর, গুলিস্তান, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুরসহ দুই সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় সড়কে জমেছে হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি, কোথাও কোথাও ফুটপাথ পানিতে ডুবে যাওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা। বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রবল বর্ষণের কাদাপানি ও ময়লা-আবর্জনায় সয়লাব সড়ক, রাস্তাঘাট, অলিগলি, বসতঘর, দোকানপাট, গুদাম, আড়ত। মজুদ প্রচুর মালামাল ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এরমধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপণ্য।
ঢাকা এবং চট্টগ্রামের নাগরিকদের সেবায় বর্তমানে তিনজন বেশ জনপ্রিয় নগর পিতা আছেন। নগর পিতারা জলাবদ্ধতা নিরসনে কি করছেন? পরিকল্পিত নগরায়ন হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না; ড্যাব বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না; নগরের খালগুলো দখলমুক্ত হলে জলাবদ্ধতা থাকবে নাÑ এসব কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে ফল পাওয়া যায় না।ক’য়েক মাস ধরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ড্রেনেজ নির্মাণ কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এসব ড্রেন পরিকল্পনা মাফিক হলে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা কিছুটা কমতে পারে এমন ধারনাই ছিলো নগরবাসীর। কিন্তু তা হয়নি। আবারও বৃষ্টির পানিতে ডুবতে হলো নগরবাসীকে।। এদিকে রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত খাল আছে; কিন্তু অস্তিত্ব নেই। খালগুলো কোথায় আছে তাই জানে না নগরবাসী। দখল হয়ে গেছে অনেক আগেই। সে কারণে জলাবদ্ধতাই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকা এবং দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মহানগর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের। সামান্য বৃষ্টিতেই স্থবির হয়ে পড়ছে কর্মব্যস্ত এই দুই শহরের জনজীবন।
জলাবদ্ধতা বর্তমানে শুধু ঢাকা কিংবা চট্রগ্রাম শহরেই নয়, প্রায় প্রতিটি বিভাগীয় বা জেলা শহরেও হর-হামেশাই দেখা যায়। প্রতিটি জায়গায় একই চিত্র, ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম খালগুলো অবৈধ দখল ও কঠিন বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে। নগরের খাল, ড্রেন, বক্স কালভার্ট ও ব্রিক সুয়ারেজ লাইন দিয়ে পানি নদীতে যেতে পারছে না। বিগত কয়েক দশকের বাস্তবতা থেকে দেখা যায়, বর্তমানে ঢাকার জলাবদ্ধতা সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যায়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী প্রায় সবকটি নদী অস্তিত্ব সংকটে ভোগছে। শুধু তাই নয়, নদী তার স্বাভাবিক অবস্থা হারিয়েছে। ঢাকায় বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। আগে বৃষ্টির পানি খাল দিয়ে নদীতে চলে যেত, কিন্তু এখন এইসব খাল বা নদী প্রায় সব ভরাট হয়ে গেছে। এসকল কারণে শহরের পানি নেমে যাবার মতো জায়গা পায় না, ফলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।
এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলে এমন ৬০টি এলাকা রয়েছে, যেখানে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা ঝুঁকিতে রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে এমনিতেই রাজধানীর জনজীবন বিপর্যস্ত। বিশেষত নি¤œবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত শ্রেণি রয়েছে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে। এর ওপর যদি নগরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা ছাড়া আর কী হতে পারে? আমরা জানি, ঢাকা 'প্রাকৃতিকভাবেই' ছিল জলাবদ্ধতাবিহীন নগরী। এর চারপাশ ও অভ্যন্তরে প্রবাহিত একাধিক নদী এবং অর্ধশতাধিক খাল তো ছিলই, উপকণ্ঠজুড়ে ছিল বিস্তীর্ণ নি¤œাঞ্চল। ফলে এই নগরীতে জলাবদ্ধতা সহজ ছিল না। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী দখল, খাল ও নি¤œভূমি ভরাট সেই জলাবদ্ধতাকেই যেন নিয়তি করে তুলেছে। প্রতিবছরই আমরা দেখি, বর্ষাকাল এলে জলাবদ্ধতা নিয়ে ভোগান্তি হয়, তা দূর করার জন্য প্রতিশ্রুতি মেলে; কিন্তু জলাবদ্ধতা আর দূর হয় না। বরং বছর বছর বাড়তে থাকে এর পরিধি ও স্থায়িত্ব। আমরা মনে করি, এখনও টিকে থাকা খালগুলো যদি সচল রাখা যায়, তাহলে জলাবদ্ধতা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণে আসতে বাধ্য। দুর্ভাগ্যবশত এই খালগুলো উদ্ধার বা সচল রাখতে সমন্বয়হীনতা কতটা প্রকট তা অনেকটাই স্পষ্ট।
পত্রিকান্তরে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সাড়ে পাঁচশ' কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে 'ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও খাল উন্নয়ন প্রকল্প' গৃহীত হলেও এর অগ্রগতি হতাশাজনক। এর আওতায় ১৬টি খাল উন্নয়নের কাজ চলতি বছর ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ প্রকল্পের কাজের তেমন অগ্রগতি নেই। প্রকৃতপক্ষে রাজধানীর খালগুলো অন্তত উদ্ধার ও সচল করার বিকল্প নেই। এ ছাড়া যত প্রকল্পই নেওয়া হোক না কেন, স্থানীয় ও তাৎক্ষণিক যত কাজই করা হোক; জলাবদ্ধতা থেকে একদা জলাবদ্ধতাহীন এই নগরীর মুক্তি নেই। আমরা মনে করি, জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজধানীর খালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। রাজধানীর খালগুলো উদ্ধারে কর্তৃপক্ষকে আরো সোচ্চার হতে হবে। রাজধানীতে এক কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। মনে রাখা দরকার, ঢাকা নগরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ কোনো সহজসাধ্য ও স্বল্প দিনের কাজ নয়। এর জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক সমন্বয় ও পরিকল্পিত কার্যক্রম।
আমরা যারা নগরে বাস করি তারাও সচেতন নই। রাজধানী এবং বন্দরনগরীর সৃষ্ট জলাবদ্ধতার পেছনে দায়ী বিষয়গুলো সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানি, বুঝি এমনকি নিয়মিত দেখিও। কিন্তু কারো মধ্যে সচেতনতা কাজ করে না। ফলে দেখা গেছে, এখনো মানুষ ঘরের জানালা দিয়ে পলিথিনের ব্যাগে করে রাতের আঁধারে ময়লা-আবর্জনা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেন, যেগুলো গিয়ে স্থান নেয় কোনো একটি পয়োনিষ্কাশন পাইপ কিংবা নালার মুখে। এতে পানি নিঃসরণের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতা। জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পেছনে আরেক অভিশাপ বলা যেতে পারে নির্মাণাধীন ভবনগুলো থেকে তৈরি উপজাতগুলোকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভবন তৈরির কাঁচামাল এনে জড়ো করা হয় রাস্তার ওপর। তার পর সেখান থেকে নিয়ে তৈরি করা হয় স্থাপনা।
বর্ষাকাল চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহানগরীর জনগোষ্ঠীর জন্যে এক মহা দুর্ভোগের কাল হিসেবেই আভির্ভূত হয়। জলাবদ্ধতায় যে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, সেই সাথে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বছরের পর বছর ধরে এ অবস্থা চলে আসছে। গত দেড়-দুই দশকে অনেক আশার বাণী শোনানো হইয়াছে এই দুই নগরের বাসিন্দাদের। কিন্তু কাজের কাজ তেমন একটা হয়নি। এ জলাবদ্ধতাকে সারা দেশের বাস্তবতা হতে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোন উপায় নাই। তবে সামগ্রিক বিচারে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই নগরির অবস্থা যে খুবই উদ্বেগজনক তা অনস্বীকার্য। আমরা আশা করি, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখবেন এবং স্থায়ীভাবে নগরবাসীর দুঃখ লাঘবে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) নগরবাসীকে জলাবদ্ধতাজনিত দুঃষহ কষ্ট থেকে রেহাই দিতে এখনও কোনো আন্তরিক উদ্যোগ নেয়নি। উপরন্তু এসব সেবাদানকারী সংস্থার কিছু তৎপরতা জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাজনিত দুর্ভোগ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে এর আগে মেয়র নির্বাচনে জনগণ বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সফল হতে পারেননি। এরপর আওয়ামীলীগের ব্যানার থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান মেয়র নাছির। তিনিও এ ব্যাপাওে ব্যর্থ হয়েছেন। এবার নৌকা পতিকে জয় পেয়েছেন রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি কতটা সফল হবেন সেটাও প্রশ্ন!
জলাবদ্ধতা নিরসনে এখনও সিটি কর্পোরেশনে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেও নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মূলত চসিক ও চউকের ব্যর্থতার কারণেই আগাম বর্ষার প্রথম বর্ষণেই তলিয়ে গেছে বন্দরনগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান প্রধান সড়কসহ অলি-গলি কোমর ও হাঁটু পানিতে ডুবে গেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, একটানা ভারিবর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিতে পানি জমে ডুবে গেছে নগরের প্রায় সকল রাস্তাঘাট। প্রায় সব রাস্তায় হাঁটুপানি। কিছু কিছু এলাকা কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বাসা বাড়ির নিচতলা ও দোকানে পানি ঢুকে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। এই পরিস্থিতির জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন দায় এড়াতে পারে না।
সিডিএ’র অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সিটি কর্পোরেশনের খালগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার না করা এবং নালা-নর্দমার ময়লা অপসারণে ব্যর্থতাই এই দুর্দশার প্রধান কারণ। নগরে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হওয়ার জন্য মূল খাল রয়েছে ১৬টি। কিন্তু নগরের প্রাথমিক ১৬টি খালের সব কটির অধিকাংশ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেদখল হয়ে গেছে। এ ছাড়া এসব খাল সময়মতো সংস্কার ও খনন করা হয়নি। কিছু কিছু খালের মাটি তোলা হলেও তা রাখা হয়েছিল পাড়ে। পরে বৃষ্টির পানিতে ওই মাটি আবার খালে পড়ে। নগরীতে অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে এমনিতেই বহু নালা-নর্দমা খাল ভরাট হয়ে গেছে, তার উপর সংস্কার নেই পুরনো খাল ও নালার। পানি ধারণক্ষম বহু পুকুর ভরাট করে দালানকোঠা ও দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি সরতে পারছে না। সহজে পানি সরে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় ভারী বৃষ্টিতে হঠাৎ এমন জনদুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে। জল নিষ্কাশনের পথগুলো উন্মুক্ত রাখলে এ জন-দুর্ভোগের সৃষ্টি হতো না।
এ বিষয়ে ডিসিসি ও চসিকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, এ দুই মহানগরে পানি নিষ্কাশনের নাজুক অবস্থার কারণেই এমনটি হয়েছে। পুকুর-জলাশয় নদী-নালা ভরাট ও বেদখল হয়ে যাওয়ার সাথে যোগ হয়েছে মহানগরের পয়ঃনিষ্কাশনের খাল দখলের প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রামের প্রধান খাল চাক্তাই খালের বিভিন্ন অংশ ভূমিগ্রাসীদের দখলে চলে যাওয়া এবং ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাওয়া। তাছাড়া, বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে তেমন বাধা না থাকায় পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিব্যাগে সয়লাব হয়ে গেছে পুরো মহানগর। পলিথিনগুলো নালা-নর্দমা ভরাট করে পানি নিষ্কাশনে বাধার সৃষ্টি করে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও নালা-নর্দমা পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করেনি। তাদের গাফিলতির কারণেই নগরের বিভিন্ন এলাকা সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায়। মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়। ক্ষতি হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদের।
প্রশ্ন হচ্ছে, নগরে মারাত্মক জলাবদ্ধতার কারণে চরম গণদুর্ভোগের পরও কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না কেন? কেনই বা নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করতে নেয়া হয়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ? এখনো কেন ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং সিডিএসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কী ভাবছেন এ সমস্যা নিয়ে? চট্টগ্রামে এখনও কিছু খাল রয়েছে যেগুলো পুনঃখনন করলে হয়তো সেগুলো পুরনো চেহারায় ফিরে আসতে পারে। আর উন্নয়নবিদ-পরিকলনাবিদরা যদি ড্রেনেজের বিষয়টা ভাবেন তাহলে পরিস্থিতি রক্ষা পেলেও পেতে পারে। কিন্তু ঢাকার পরম সম্পদ চারটি নদীও দখলে-দূষণে শেষ হওয়ার পথে। রাজধানী ঢাকাকে অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত করায় খাল, পুকুর, জলাশয়ের সংখ্যা কমছে দ্রুততার সাথে। ফলে সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে।
পৃথিবীর বহু দেশে নগরায়নের পরও নদীরক্ষা ও নিষ্কাশন সুব্যবস্থার নজির আছে। তাহলে আমরা কেন পারছি না? এজন্য আমাদের সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, ওয়াসা প্রভৃতি সংস্থারও দায়ভার আছে। তবে এসব সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ‘নগর সরকার’ গড়ার বিষয়টি নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু নগর সরকারের দেখা মিলছে না। নগর সকরার গঠন করে সকল নগরের জলাবদ্ধতাসহ নাগরিক সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছার অভাবে তা যেন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। তাই প্রশ্ন জাগে, জলাবদ্ধতা নিরসনের স্বপ্ন কি বাস্তবায়ন হবে? আমাদের বিশ্বাস, অবশ্যই হবে। এজন্য সকল অপশক্তির লাগাম টেনে ধরতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ন করতে হবে, নদী, খালগুলো দখল মুক্ত কতে হবে। তাহলেই নগরের জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হবে। আর নগর পিতারা যদি সেদিকে দৃষ্টি দেন তাহলে সেটা খুব সহজেই সম্ভব।


লেখক : সাংবাদিক,কলামিস্ট ও সমাজ গবেষক।

শেয়ার করুন

পাঠকের মতামত