নির্বাচনের আগে উদ্বেগ বাড়াল রহস্যময় চিঠি, ক্যালিফোর্নিয়ার অন্তত ৯ আইনপ্রণেতা লক্ষ্যবস্তু
প্রথমবার হারান ৫ লাখ ডলার, এরপরও একই প্রতারণার ফাঁদে পা দিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
অনলাইনে প্রেমের সম্পর্কের আড়ালে পরিচালিত প্রতারণায় জীবনের সঞ্চয় ৫ লাখ ডলার হারিয়েছেন উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি। কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আবারও একই ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পড়েন তিনি। এবার নতুন পরিচয়ে আসা এক নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে অর্থ পাঠাতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারের উদ্বেগ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের হস্তক্ষেপে প্রতারণার বিষয়টি তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভুক্তভোগী আদান লুক সান ফ্রান্সিসকোর একজন অবসরপ্রাপ্ত নগর উদ্যানকর্মী। গত বছর ফেসবুকে অ্যানি নামের এক নারীর সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তাঁদের সম্পর্ক ভবিষ্যতে নতুন জীবনের সূচনা করবে। ওই নারী তাঁকে জানান, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করে তিনি লাখ লাখ ডলার আয় করেছেন। আদানও বিনিয়োগ করলে ভালো অর্থ উপার্জন করতে পারবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি। এমনকি হাওয়াইয়ে স্বপ্নের বাড়ি তৈরির কথাও বলা হয়।
এই আশ্বাসে বিশ্বাস করে আদান এশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা পাঠাতে থাকেন। পরিবার ও বন্ধুদের সতর্কবার্তাও উপেক্ষা করেন তিনি। একপর্যায়ে তাঁর সব অর্থ শেষ হয়ে যায়। তখন তিনি বুঝতে পারেন, বিনিয়োগের সুযোগটি ছিল ভুয়া এবং অ্যানি নামের ওই নারীর পরিচয়ও সত্য ছিল না। সব মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ ডলার হারান তিনি।
কিন্তু প্রথম প্রতারণার পরও তাঁর অনলাইন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা বদলায়নি। অর্থ হারানোর পরপরই ভিকি নামের আরেক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় আদানের। ওই নারী নিজেকে কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন কমব্যাট মেডিক হিসেবে পরিচয় দেন। দাবি করেন, চার বছর পর দায়িত্ব শেষ হলে তাঁরা একসঙ্গে থাকতে পারবেন। আদানও তাঁকে নিজের জীবনের বিশেষ একজন হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
ভিকি ধীরে ধীরে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ চাইতে থাকেন। কখনো নিজের জন্য আইফোন, কখনো অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, আবার কখনো ছেলের জন্য আইপ্যাড কেনার কথা বলেন। আদান জানান, আগের প্রতারণায় তাঁর সব অর্থ হারিয়ে গেছে। জবাবে ভিকি তাঁকে আবার আর্থিকভাবে দাঁড়াতে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এরপরও অর্থ চাওয়া বন্ধ করেননি।
আদানের ছেলে জোনাথন লুক লেনদেনগুলো দেখে সন্দেহ করতে শুরু করেন। তাঁর মতে, ভিকির কথাবার্তা ও অর্থ চাওয়ার ধরনে আগের প্রতারণার সঙ্গে মিল ছিল। ভিকি একপর্যায়ে দাবি করেন, দ্রুত সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি পেতে তাঁর কমান্ডারকে অর্থ দিতে হবে। এ জন্য প্রায় ৪৫ হাজার ডলার চান তিনি। আদান সেই অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের বাড়ি বন্ধক রাখার ঝুঁকিতেও পড়েন।
এর মধ্যে ব্যাংক অব আমেরিকা সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে প্রিসিলা নামের একজনের কাছে আদানের পাঠানোর চেষ্টা করা ২ হাজার ডলারের তিনটি ট্রান্সফার আটকে দেয়। তবে আদান জেলির মাধ্যমে ১ হাজার ডলার এবং অ্যাপল গিফট কার্ডের মাধ্যমে আরও ১ হাজার ডলার পাঠান। তাঁর ছেলে বিভিন্ন অ্যাপল স্টোরে যোগাযোগ করে কর্মীদের সতর্ক করেন, যাতে প্রতারিত হয়ে তাঁর বাবা আবার অর্থ পাঠাতে না পারেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি দল আদানের সঙ্গে কথা বলে। তাঁরা ভিকির পাঠানো ছবির রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখেন, একই ছবি অন্য একটি নাম ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্কদের ডেটিং সাইটে রয়েছে। অর্থাৎ, ছবিটি ভিকির প্রকৃত পরিচয়ের প্রমাণ ছিল না। মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভিকির দেওয়া পরিচয়ের সঙ্গে মেলে—এমন কোনো সেনাসদস্যের অস্তিত্ব নেই বলে তাঁরা অত্যন্ত নিশ্চিত।
প্রতারণা শনাক্ত করতে কাজ করা বিশেষজ্ঞ এরিন ওয়েস্ট আদানকে বোঝান, এ ধরনের প্রতারকরা সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর আবেগ ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি মিলে একই পরিচয়ে যোগাযোগ করে এবং বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় এমন ছবি ও কথোপকথনের স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে।
সব প্রমাণ দেখার পর আদান ভিকিকে ব্লক করেন। তবে এরপরও তিনি সুজি নামের আরেক নারীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন বলে জানা যায়। ফলে ভবিষ্যতে আবার প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
এই ঘটনায় আদান ও তাঁর ছেলের মধ্যে সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হলেও একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজের সম্মতিতে অর্থ পাঠালে তাঁর লেনদেন বন্ধ করার ক্ষমতা পরিবারের হাতে সব সময় থাকে না। তাই অনলাইনে পরিচিত কারও সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলে তাঁর পরিচয় যাচাই করা এবং ব্যক্তিগতভাবে কখনো দেখা হয়নি—এমন কাউকে অর্থ না পাঠানোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন