যুক্তরাষ্ট্র-হুথি হামলার পর প্রথমবার ১০০ ডলার ছাড়াল তেলের দাম
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সৌদি আরবে হুথিদের হামলার জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ১০০ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছায়। গত জুলাইয়ের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল।
মঙ্গলবারের তুলনায় বুধবার তেলের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর আগে, গত ফেব্রুয়ারিতে, প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার কারণে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সাধারণত এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ওমান উপসাগরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। জাহাজগুলো হলো—কাভিজ, চারমিনার, হরাইজন-১ ও রিয়েস্কো। এ ছাড়া উত্তর উপসাগরে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপের কাছে ডেরিয়া নামের আরও একটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়।
সেন্টকমের দাবি, হামলার আগে জাহাজগুলোর ক্রুদের জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এর আগে দুই দিনের মধ্যে দুইবার ইরানের আইআরজিসি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। তবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি সফলভাবে হামলা এড়িয়ে যায় এবং কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি।
অন্যদিকে ইরানের আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা জর্ডানে থাকা মার্কিন মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটির রক্ষণাবেক্ষণকেন্দ্র, হ্যাঙ্গার ও বিমান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ২০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে। আরও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়েছে। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পরে ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করে, হরমুজ প্রণালিতে তারা দুটি মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে এবং এসব জাহাজে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে মার্কিন সেন্টকম এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজে হামলার কথা সত্য নয়।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, উত্তর উপসাগর ও ওমান উপসাগরে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলমান সামরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে হামলার শিকার হয়েছে বলে তারা খবর পেয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পোর্ট রশিদের ৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে একটি জাহাজ নোঙর করা অবস্থায় একদিকে কাত হয়ে থাকতে দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অজ্ঞাত কোনো অস্ত্রের হামলার পর জাহাজটিতে পানি ঢুকেছে।
ইরাকের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পানামার পতাকাবাহী ‘নিউ অ্যান্ড্রোস’ নামের একটি ট্যাংকারে ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। জাহাজটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল ছিল। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
এদিকে ইরানের আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি জানিয়েছেন, শিগগিরই তারা জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ ঘোষণা করবে। এই এলাকা হরমুজ প্রণালির বাইরেও ওমান সাগর ও আরব সাগরের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ওই এলাকায় সমন্বয় ছাড়া কোনো জাহাজ প্রবেশ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার বলেন, ইরান যদি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলার চেষ্টা চালিয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালাবে।
এর আগে ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন চালকবিহীন সাবমেরিন আটক করার দাবি করেছিল। তবে মার্কিন সেন্টকম জানায়, সেটি একটি পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোন ছিল, যা এক দিনেরও বেশি সময় আগে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারায়। আঞ্চলিক জলসীমা পর্যবেক্ষণের কাজে সেটি ব্যবহার করা হচ্ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও। ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। মঙ্গলবার হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরান শহরের বিভিন্ন বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে কয়েক ডজন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এতে ৭৩ জন বেসামরিক মানুষ আহত হন। হামলায় কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায় এবং সাময়িকভাবে সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
হুথিরা দাবি করেছে, বুধবার সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মারিব, জাওফ, তাইজ, হুদাইদাহ, সাদা ও বায়দা প্রদেশে ৫০টির বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে সৌদি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে রোববার ও সোমবার সৌদি হামলার পর হুথিরা অভিযোগ করে, হাজম এলাকায় একটি কারাগারেও বোমা হামলা চালানো হয়েছে। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়া জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত ২৩ জন বেসামরিক নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার থেকে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলেও তীব্র লড়াই চলছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে হুথিরা। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির দামে পড়তে শুরু করেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন