যুক্তরাষ্ট্রে আজ বৃহস্পতিবার, ০৪ Jun, ২০২০ ইং

|   ঢাকা - 05:00am

|   লন্ডন - 12:00am

|   নিউইয়র্ক - 07:00pm

  সর্বশেষ :

  দেশে ১০ জেলায় বজ্রপাতে ২২ জনের মৃত্যু   লস এঞ্জেলেস কাউন্টিতে বৃহস্পতিবার কারফিউ থাকছে না: শেরিফ   জর্জ ফ্লয়েড হত্যা: বিক্ষোভে ট্রাম্পের মেয়ের সমর্থন   করোনায় রানা প্লাজার মালিকের মৃত্যু   দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ৩৫, নতুন শনাক্ত ২৪২৩   রবিবার ফেসবুক ও ইস্টাগ্রাম লাইভে আসছেন পাপী মনা   যেভাবে করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখবেন   বিশ্বব্যাপী একদিনে করোনা থেকে সুস্থ দেড় লাখ, মৃত্যু সাড়ে ৫ হাজার   ক্যালিফোর্নিয়ায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে তরুণরা   প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ   পুলিশের বাজেট বাড়ছে না, ব্ল্যাক কমিউনিটি বরাদ্দ পাবে ২৫০ মিলিয়ন ডলার   করোনায় একদিনে গেল আরও ৪৬ প্রাণ, আক্রান্ত ৫৮ হাজার ২৩৪   যেভাবে বর্ণবাদের ইতিহাসে নাম লেখাল যুক্তরাষ্ট্র   এখনো চলছে বর্ণবাদ   যুক্তরাষ্ট্রের পতন কি অনিবার্য!

মূল পাতা   >>   কলাম

এই নিউইয়র্ক আমি চাই না

ইশতিয়াক রূপু

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-২৭ ১৯:৩৬:৪৩

ইশতিয়াক রূপু: আসছে গ্রীষ্মে আমার নিউইয়র্কে বাসের এক যুগ পূর্ণ হবে। বেশি দিন ধরে নিউইয়র্কে বাস করছেন এমন কেউ হয়তো বলবেন, এক যুগ তথা ১২ বছর এমনকি সময়? যা নিয়ে ঘটা করে কিছু বলতে বা লিখতে হবে। তা আমারও জানা। তবুও নিউইয়র্ক ঘিরে আমার ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে নিজ অভিব্যক্তি লেখা উচিত বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।
আমেরিকাতে আসা অভিবাসীদের নিয়ে একটি কথা প্রচলিত আছে। তা হলো—অভিবাসীদের বয়ে নিয়ে আনা বিমানটি যে শহরে অবতরণ করবে, অধিকাংশ প্রবাসীদের জীবনগল্পের শুরু এবং শেষ এই শহরকে নিয়েই। নিজ জীবন নাটকের চিত্রনাট্য লেখা ও মঞ্চস্থ হয় সেই প্রথম আসা শহরে। সে ক্ষেত্রে আমার চিত্রনাট্য বেশ ব্যতিক্রম। ২০০৬ সালে আমেরিকা এসে উঠলাম ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে ভাইয়ের বাসায়। নিজের চাকরিসহ সন্তানদের লেখাপড়ার শুরু হলো বেশ ভালোভাবে। তবে এমনতর পরিবেশ আমার প্রথমে মোটেই ভালো লাগেনি। একঘেঁয়ে যাপিত জীবন। মনে শান্তি নাই। গতানুগতিক জীবন বাস। সকালে উঠে কাজে যাও। বিকেলে কাজ থেকে নিজ বাসায় টিভির সামনে বসে সময় কাটানো অথবা কোন স্বজন অথবা ভাই–ভাবিদের নিয়ে স্বল্প সময়ের নিরামিষ আড্ডা। প্রতিদিন ভাই–ভাবির একই চেহারা দেখে দেখে অনেকটা অসহায় হয়ে একদিন ভাবিকে বললাম, ভাবি আগামীকাল যদি পারো একটি মুখোশ পরে আস। তখন হয়তো আমার মনে হবে নতুন একটি চেহারা দেখতে পেলাম।
পাঠকেরা হয় তো ভাবছেন, আমি একজন বোহিমিয়ান টাইপের কেউ। আসলে তা নয়। দেশে থাকতে আমি প্রায় প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক সমাবেশ ও খেলাধুলায় সংযুক্ত থাকতে ভালোবাসতাম। যা এখানে এসে পুরোপুরি পাওয়া ছিল দুষ্কর। তবে বর্তমানে আমেরিকার সর্বত্র অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক উৎসবের কমতি নেই। অনেক স্থানে তা বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ বটে। নিউইয়র্কের বন্ধু–বান্ধব, অনেক চেনা স্বজনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ফোনে যোগাযোগ থাকাতে নিউইয়র্কের সব সামাজিক অনুষ্ঠানের হালনাগাদ খবর বরাবর পেতাম। বছরব্যাপী আয়োজিত সব উৎসবসহ আঞ্চলিক নির্বাচন আয়োজনের খবর শুনে মন খুবই খারাপ হতো। ভাবতাম যদি নিউইয়র্কে অভিবাসী জীবন শুরু করতাম, সবাইকে এভাবে এক সঙ্গে পেতাম।
নিউইয়র্কে ফিরে আসার ইচ্ছে ও আকুলতা একেবার চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে আসায় কোন পূর্বপরিকল্পনা না করেই হট করে চলে এলাম ভালোবাসা আর স্বপ্নের নিউইয়র্ক শহরে। কুইন্সের উডসাইডে তিন রুমের বাসা ভাড়া নিলাম একটু আয়েশে থাকার অভিপ্রায়ে। নিউইয়র্ক বাসের প্রথম দিন বাসার পাশে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা উডসাইডে নিউইয়র্কের বৃহত্তম আঞ্চলিক সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। নগরজুড়ে তিনটি ভোট কেন্দ্রের একটি উডসাইড। সেখানে উপস্থিত হয়ে একেবারে হতবাক। কেন্দ্রের চারপাশে সিলেটী অভিবাসী ছাড়াও নিউইয়র্কে বসবাসরত অন্যান্য জেলার নেতৃবৃন্দ সদলবলে উপস্থিত। পুরো এলাকা দেশীয় স্টাইলে ভোট প্রদানের পরিবেশে উৎসবমুখর। সেই আনন্দঘন পরিবেশে হঠাৎ দেখা আমার একজন আত্মীয়ের সঙ্গে, যিনি আমাকে ম্যারিল্যান্ডেও দেখেছিলেন। তিনি আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, আজ দেখি আপনি ভীষণ খোশমেজাজে আছেন! আপনি পুরোই বদলে গেছেন। উত্তরে বললাম, সুবোধ বালকেরা নীরব বনে সুন্দর, আড্ডাবাজরা রাস্তার মোড়ে। হেসে উত্তর দিলেন, দারুণ বললেন ভাইজান।
প্রথমে মাসখানিক গেল আত্মীয়স্বজনের বাসায় দাওয়াত নিমন্ত্রণের আবদার রক্ষা করতে করতে। চাকরি নিয়ে সবার নানা পরামর্শ আর উপদেশের কমতি নেই। তবে আমি একটু বেশি নিশ্চিত হয়ে বসে রইলাম। ধারণা ছিল, নিউইয়র্কের তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র রাজ্য ম্যারিল্যান্ডে চাকরি পেলাম অল্প কয়দিনে। আর নিউইয়র্কের মত শহর যেখানে হাজার হাজার সেবা প্রতিষ্ঠান আর বাণিজ্যিক স্থাপনায় চারদিক ঘেরা, সেখানে সামান্য উদ্যোগে আমার চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু ২০০৯ সালের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সারা দেশে তখন চলছে স্মরণকালের ভয়াবহ মন্দা। শত শত প্রতিষ্ঠানে চলছে লে অফ। কোথাও কর্মচারী ছাঁটাই প্রক্রিয়া। যেখানেই যাই, সবাই বলে দুঃখিত ‘নো হায়ারিং’।
বেশ কয়েক দিন এখানে–সেখানে নানাজনের রেফারেন্স নিয়ে ঘোরাফেরা করে কোন লাভ হল না। এদিকে জমানো ডলারে চলছে লাল সিগন্যাল। বাধ্য হয়ে দেশে রাখা ভালো পরিমাণের টাকাকে ডলার বানিয়ে আনা হল নিউইয়র্কে। এভাবে বছরের কিছু কম সময় চলার পর পাওয়া গেল মোটামুটি মধ্যম আয়ের চাকরি। সন্তানেরা কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেরা শুরু করল খণ্ডকালীন কাজ। দ্রুত আমরা পরিবারের সবাই নিউইয়র্কের ‘লাইফ লিভ নাইসলি’ ট্র্যাকে চড়ে বসলাম, যা চলতে লাগল তার নির্দিষ্ট গতিতে। জীবন ক্রমে সুন্দর আর আনন্দ অনুভবে চলমান হলো নানা আয়োজনে আর উৎসবে।
দিন–রাত নির্ঘুম শহর নিউইয়র্কের উৎসব আর আনন্দে সময় কাটানোর নানা রূপ ধীরে ধীরে নিজেই দেখতে পেলাম। দিন রাত ২৪ ঘণ্টা সপ্তাহে সাত আর বছরে ৩৬৫ দিন পুরো সময় নিউইয়র্কবাসী ছুটছে। আমেরিকার মেডিকেল জার্নালে খবর বেরোল, আমেরিকার সব রাজ্যের অধিবাসীদের মধ্যে নিউইয়র্কবাসীর গড় আয়ু বেশি। কারণ লোকজন পায়ে হেঁটে বেশি চলাচল করে, শারীরিক ব্যায়াম করতে জিমে সময় কাটায়। তা ছাড়া বছরব্যাপী নানা ধরনের ছোট–বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মনোরঞ্জনের শতভাগ পূর্ণ করতে পারে, যা অন্যান্য রাজ্য কিছুটা হলেও সীমিত।
নিউইয়র্ক আসতে না আসতেই শুরু গ্রীষ্মকালীন নানা উৎসব, মেলা আর বনভোজন। বয়স ভেদে সব অভিবাসী, জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে সবাই ছুটছেন রাজ্যের নানা অবকাশযাপন কেন্দ্রে। বাঙালিরা দল বেঁধে বাস ভাড়া করে গান গাইতে গাইতে চলছেন সাগর তীরের নির্ধারিত পিকনিক স্পটে। ছোট বড় সবার কী যে আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। এত সবের পাশাপাশি স্থানীয় ও জেলাভিত্তিক সামাজিক সমিতির আয়োজনে ঈদ ও পূজা পুনর্মিলনী, ইফতার পার্টিসহ দেশ থেকে আগতদের ঘটা করে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। সব জায়গায় প্রবাসীদের মিলন মেলা। যেখানে একে অপরের সঙ্গে দেখা–সাক্ষাৎসহ মনের ভাব বিনিময়ে সবাই যেন উন্মুখ হয়ে থাকেন প্রবাসীরা।
সেই চিরযৌবনা আর ভালোবাসার ফুলেল সৌরভ নিয়ে যে, নিউইয়র্ক শহর সারাক্ষণ মেতে থাকতম, কলকল আওয়াজে আনন্দের জলস্রোতে পরিপূর্ণ থাকত দুপুরে, বিকেলে আর সন্ধ্যায় কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকার হিলসাইড আর ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারের কালো পিচঢালা জনপদে, আজ কিনা সেই মুখরিত জনপদ আর শত শত কবি সমাজসেবক আর রাজনীতিবিদদের চায়ের কাঁপে ঝড় তোলা আড্ডার দেখা মিলে না। জ্যাকসন হাইটের ১৫/২০টি ব্যস্ত খরিদ্দারের পরিপূর্ণ খাবার দোকানের সব চেয়ার উল্টিয়ে রাখা। এক কাপ চা নিতে যেখানে লাইনে দাঁড়াতে হতো, আজ সেই লাইন উধাও। সব ধর্ম–বর্ণসহ নানা গোষ্ঠী আর গোত্রের মিলন স্থল বলে দুনিয়া জোড়া ইতিমধ্যে সুখ্যাতি পাওয়া জ্যাকসন হাইটের ডাইভারসিটি প্লাজা আজ নীরব, নিস্তব্ধ। শূন্য চত্বরে অভিবাসীরা হিমশীতল ঠান্ডায় ধূমায়িত চায়ের কাপ নিয়ে বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করে না। সবাই আজ নিজ গৃহে স্বেচ্ছাবন্দী।
যে নিউইয়র্কের রাস্তায় রোড রেইজ (পথ বিবাদ) ছিল নিয়মিত আর স্বাভাবিক দৃশ্য, আজ সেই ব্যস্ত বি কিউ হাইওয়ে, হিলসাইড অ্যাভিনিউসহ নগরের অধিকাংশ রাজপথ সুনসান নীরব, ভীষণ ফাঁকা। যা আমার এক যুগের নিউইয়র্ক বাসে কখনো চোখে পড়েনি, যাই দেখি তাই মনে হয় অবিশ্বাস্য। যা ভুলেও কখনো নিজ ভাবনায় আসেনি। চারদিকে আতঙ্কের চাহনি, আগামীর অনিশ্চিত দিন–রাত, কত দিন থাকবে করোনার এই তাণ্ডব। প্রাণ সংহারের এই অজেয় দৈত্যের কবলে কার হবে জীবননাশ, সেই রূপ হাজারো ভাবনা আর উৎকণ্ঠায় নিউইয়র্ক নগরে আনন্দহীন নগরীতে রূপান্তরিত হতে চলছে। ভালোবাসার নিউইয়র্কে আজ শুধু ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি। কী হবে আজ অথবা আগামীকাল? সে জিজ্ঞাসার ভার নগরবাসীর নিকট বড্ড ভারী লাগছে। সেই ভার সইতে হবে কত দিন কে জানে? ভালোবাসার আর কর্মচঞ্চল নিউইয়র্ক নগর ফিরে আসুক আগের সেই রূপে, এই মুহূর্তে ৬০ লাখ নিউইয়র্কবাসীর একমাত্র কামনা সেটি বলেই আমার বিশ্বাস।
-প্রথম আলোর সৌজন্যে

এই খবরটি মোট পড়া হয়েছে ২২৯ বার

আপনার মন্তব্য

সর্বাধিক পঠিত