নির্বাচনের আগে উদ্বেগ বাড়াল রহস্যময় চিঠি, ক্যালিফোর্নিয়ার অন্তত ৯ আইনপ্রণেতা লক্ষ্যবস্তু
ইরান ইস্যুতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—জটিল সিদ্ধান্তের মুখে যুক্তরাষ্ট্র
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
ইরানে চলমান সহিংস দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে জটিল হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি এখন ‘সিদ্ধান্তের সময়’।
প্রায় দশ দিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানি সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের “রক্ষায় এগিয়ে যেতে” প্রস্তুত। সে সময় তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র “লকড অ্যান্ড লোডেড”—অর্থাৎ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে তখনো ইরানে দমন-পীড়নের ভয়াবহতা পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। এখন পরিস্থিতির ভয়ংকর চিত্র সামনে আসায় বিশ্ব তাকিয়ে আছে—ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়া কেউ জানে না তিনি কী করবেন। বিশ্ব অপেক্ষা করতে ও অনুমান করতে পারে।” তবে প্রশ্ন উঠছে—এই অপেক্ষা আর কতদিন?
মঙ্গলবার শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে প্রেসিডেন্টকে ব্রিফ করার কথা রয়েছে। রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি “খুবই শক্ত কিছু বিকল্প” বিবেচনা করছেন।
ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক অভিযানে সাফল্যের পর—যেখানে নিকোলাস মাদুরোকে আটক করাকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম সফল অভিযান বলে উল্লেখ করেন—ইরানের ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রলোভন যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট।
গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র দূরপাল্লা থেকে আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে। মিসৌরির হুইটম্যান বিমানঘাঁটি থেকে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান ৩০ ঘণ্টার যাত্রা করে ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ফেলেছিল।
ওয়াশিংটন আবারও এমন দূরপাল্লার হামলা চালাবে নাকি বর্তমান দমন-পীড়নের জন্য দায়ী শাসনব্যবস্থার নির্দিষ্ট অংশে লক্ষ্যভিত্তিক আঘাত হানবে—এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে লক্ষ্যবস্তুর দীর্ঘ তালিকা রয়েছে।
বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রীয় অংশীদার সিবিএস নিউজের উদ্ধৃতিতে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামরিক হামলার বাইরে সাইবার অপারেশন ও গোপন মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের মতো কৌশলও বিবেচনায় আছে, যার উদ্দেশ্য হবে ইরানের কমান্ড কাঠামোকে বিভ্রান্ত ও দুর্বল করা।
তবে কারাকাসে ৩ জানুয়ারির মতো সরাসরি অভিযান—যেখানে এক ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলের চেষ্টা হয়েছিল—ইরানে সেই ধরনের কিছু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। দুর্বল অবস্থায় থাকলেও ইরান ভেনেজুয়েলা নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি যুদ্ধ-অভিজ্ঞ শাসনব্যবস্থা, যেখানে একজনকে সরিয়ে দিলেই পুরো দেশ ভেঙে পড়বে—এমনটি unlikely।
ট্রাম্প নিজেও ১৯৮০ সালে জিমি কার্টারের ব্যর্থ ইরান অভিযান থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। সেই অভিযানে ইরানের মরুভূমিতে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় আট মার্কিন সেনা নিহত হন, যা পরবর্তীতে কার্টারের নির্বাচনী পরাজয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে ৪৬ বছর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ট্রাম্প প্রশাসন আসলে ইরানে কী অর্জন করতে চায়?
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক উইল টডম্যান বলেন, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য সম্ভবত শাসন পরিবর্তন নয়, বরং ইরানি সরকারের আচরণে প্রভাব ফেলা। তার মতে, এটি হতে পারে পারমাণবিক আলোচনায় ছাড় আদায়, দমন-পীড়ন বন্ধ করা বা সংস্কারের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ তৈরি।
হোয়াইট হাউসের দাবি, ইরানের শাসনব্যবস্থার কিছু অংশ গোপনে আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে, যদিও প্রকাশ্যে তাদের বক্তব্য ভিন্ন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা প্রথমে কূটনীতির পথে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
তবে ইরানে যদি রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন চলতেই থাকে, তাহলে কূটনীতি দুর্বলতার বার্তা দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বিক্ষোভকারীদের মনোবল ভেঙে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সীমিত সামরিক হামলা বিক্ষোভকারীদের সাহস জোগাতে পারে—এমন মতও আছে। আবার একই সঙ্গে আশঙ্কা রয়েছে, এতে শাসনব্যবস্থার সমর্থকেরা আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে এটি ট্রাম্পের জন্য এক অত্যন্ত জটিল সিদ্ধান্ত। কারণ ইরান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা পাল্টা জবাব দেবে। এখনো ইরানের হাতে উল্লেখযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, আর মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর পুরো শক্তি শেষ হয়ে যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসে সবাই জানেন—ইরান প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে তা তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন