ট্রাম্প নীতির প্রভাবে বিদেশি জনসংখ্যা কমল ১৫ লাখ, হুমকিতে ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতি
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বছরে কঠোর অভিবাসন নীতি ও দেশজুড়ে অভিযান বৃদ্ধির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৫ লাখ। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ক্যালিফোর্নিয়ায়, যেখানে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে রাজ্যের জনসংখ্যা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরো।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার জনসংখ্যায় তেমন কোনো বৃদ্ধি হয়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা বেড়েছে মাত্র ০.৫ শতাংশ বা প্রায় ১৮ লাখ, যা আগের বছরের ৩২ লাখ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসন কমে যাওয়াই এই স্থবিরতার প্রধান কারণ। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং লস অ্যাঞ্জেলেসসহ বড় শহরগুলোতে নির্বাসন অভিযান জোরদার করায় যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি অভিবাসীর সংখ্যা কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বিদেশে জন্ম নেওয়া জনসংখ্যা কমেছে ১৫ লাখ বা ২.৬ শতাংশ।
ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজ্য ছাড়ার প্রবণতা, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং জন্মহার কমে যাওয়াও জনসংখ্যা সংকোচনের জন্য দায়ী। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসসি) নীতি পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাওয়েল মায়ার্স বলেন, “এটা খুবই অস্থির সময়, বিশেষ করে অভিবাসন নিয়ে। বয়স বা জন্মহার দ্রুত বদলানো যায় না, কিন্তু অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমাদের শ্রমবাজারে যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে অভিবাসন ছিল বড় ভরসা।”
গত ১২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বনিম্ন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখা গেছে ২০২১ সালে—মাত্র ০.১৬ শতাংশ। তখন কোভিড মহামারির কারণে ভ্রমণ সীমাবদ্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন ছিল খুব কম। এর আগে ১৯১৯ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ০.৫ শতাংশের নিচে।
সেন্সাস তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নেট আন্তর্জাতিক অভিবাসন সর্বোচ্চ ২৭ লাখে পৌঁছায়। কিন্তু পরের বছর তা অর্ধেকেরও বেশি কমে যায়। ২০২৪–২৫ সময়ে নেট অভিবাসন নেমে আসে ১৩ লাখে। সেনসাস ব্যুরোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও কমে মাত্র ৩ লাখ ২১ হাজারে নামতে পারে। এমন ধারা অব্যাহত থাকলে, ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে নেট অভিবাসন ঋণাত্মক হতে পারে—অর্থাৎ আগমনের চেয়ে প্রস্থান বেশি হবে।
ক্যালিফোর্নিয়া ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্স জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আগমন কমে যাওয়ায় রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি আরও শ্লথ হবে। ইউসি আরভাইনের অর্থনীতির এমেরিটাস অধ্যাপক জান ব্রুকনার বলেন, “জনসংখ্যা বৃদ্ধি মানেই শ্রমশক্তির বৃদ্ধি। যদি জনসংখ্যা কমে বা স্থবির থাকে, তাহলে শ্রমবাজারে সংকট তৈরি হয়—বিশেষ করে অদক্ষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে।”
ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্স আরও জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের মানবিক অভিবাসন কর্মসূচির বড় অংশ বাতিল হওয়াও ক্যালিফোর্নিয়ার জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে উচ্চ জীবনযাত্রার খরচ ও আবাসন সংকটের কারণে অনেক ক্যালিফোর্নিয়ান টেক্সাস ও অ্যারিজোনার মতো রাজ্যে চলে যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী প্রায় ১৯ বছরের মধ্যে টেক্সাসের জনসংখ্যা ক্যালিফোর্নিয়াকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। গভর্নর গ্যাভিন নিউজমের বিরুদ্ধে সমালোচকরা আবাসন সংকটের জন্য তাকে দায়ী করলেও তিনি দাবি করেন, আরও অন্তত ১০টি রাজ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার তুলনায় বেশি হারে জনসংখ্যা কমেছে।
ডাওয়েল মায়ার্স বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজ্য ছাড়ার প্রবণতা কমানো এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় শিক্ষিত তরুণদের ধরে রাখা। আমরা তাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করেছি, কিন্তু তারা কাজ পেলেও বাসস্থান পাচ্ছে না। আবাসন সংকটই আমাদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় হুমকি।”
এলএবাংলাটাইমস/ওএম
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন