ট্রাম্পকে ঘিরে সম্মেলনে সরব রিপাবলিকানরা, নেপথ্যে ২০২৮-এর উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দলের অবস্থান শক্ত করতে ডালাসে দুই দিনের সম্মেলনে জড়ো হয়েছিলেন রিপাবলিকান নেতাকর্মীরা। তবে সম্মেলনজুড়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি ও প্রভাব যতটা স্পষ্ট ছিল, ততটাই সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন—ট্রাম্পের পর দলের নেতৃত্ব দেবেন কে?
সমর্থকদের কাছে ‘ট্রাম্প-আ-পালুজা’ নামে পরিচিত এই সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দেওয়া। কিন্তু সম্মেলন শেষে অনেক নেতাকর্মীর মধ্যেই ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ট্রাম্প-পরবর্তী রিপাবলিকান রাজনীতি নিয়ে আলোচনা।
সম্মেলনের শেষ দিনে মূল বক্তব্য দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, “আগে আমাদের নভেম্বরে কাজটা শেষ করতে হবে। এরপর কী হবে, সেটা নিয়ে ভাবব।”
ভ্যান্সের বক্তব্যের একপর্যায়ে দর্শকদের একটি অংশ ‘৪৮’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। ২০২৮ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের উত্তরসূরি নির্বাচিত হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮তম প্রেসিডেন্ট হবেন—সেই ইঙ্গিতেই স্লোগানটি দেওয়া হয়। ভ্যান্স কিছুক্ষণ তা চলতে দিলেও পরে হাত নেড়ে থামিয়ে দেন।
তবে সম্মেলনে অংশ নেওয়া রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পকে সামনে রেখে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণা চালানোর কৌশল নিয়ে মতভেদ ছিল। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া, অর্থনীতি নিয়ে মানুষের অসন্তোষ এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে দলের ভেতরে।
ভার্জিনিয়া রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান জেফ রায়ার বলেন, এই সম্মেলন নির্বাচনী বার্তা বড় পরিসরে পরীক্ষা করার সুযোগ দিয়েছে। তাঁর মতে, এতে দলের প্রচারণার বার্তা ভোটারদের কাছে কীভাবে কাজ করছে, তা বোঝা যাবে।
তবে এক রিপাবলিকান কৌশলবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ট্রাম্পের প্রায় দুই ঘণ্টার দীর্ঘ বক্তব্য ভোটারদের মনোভাব বদলাতে খুব একটা ভূমিকা রাখবে না। ট্রাম্প ভোটারদের উদ্দেশে ‘আমি যেন ব্যালটে আছি—এমনটা ধরে নিন’ ধরনের আহ্বান জানালেও সেটি খুব কার্যকর হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। সিনেটেও লড়াই হতে পারে, যদিও সেখানে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
ট্রাম্প-পরবর্তী রিপাবলিকান নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা
ডালাসের সম্মেলনজুড়ে ট্রাম্পের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের রিপাবলিকান প্রার্থীরা একের পর এক বক্তৃতায় তাঁর প্রশংসা করেন। সমর্থকদের বড় অংশের মাথায় ছিল ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা লাল ‘মাগা’ টুপি।
মাত্র দুই দিনের সম্মেলন হলেও আয়োজনের ধরন ছিল অনেকটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়কার প্রচলিত চার দিনের জাতীয় সম্মেলনের মতো। ছিল ব্যানার, সাইন, লাইভ মিউজিক এবং শেষ মুহূর্তে বেলুন উড়িয়ে উদযাপন। এর আগে রিপাবলিকানরা কখনো মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ ধরনের সম্মেলন আয়োজন করেনি।
জর্জিয়ার রিপাবলিকান কর্মী ভিকি কনসিলিও বলেন, এই সম্মেলনের মাধ্যমে ট্রাম্প আবারও দেখিয়েছেন কীভাবে তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা বদলে দিতে এবং পুরো দেশের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন।
সম্মেলনে ট্রাম্পের একটি বড় ঘোষণাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি বলেন, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে সব প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানকে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়া হবে।
তবে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন থাকলেও অনেক রিপাবলিকান নেতাকর্মী এখন দলের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন। ট্রাম্পপন্থী সংগঠন ‘দ্য বুল মুজ প্রজেক্ট’-এর প্রেসিডেন্ট ২৬ বছর বয়সী এইডেন বুযেত্তি বলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর নিয়ে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন এবং দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প রিপাবলিকান রাজনীতিকে বদলে দিয়েছেন, তবে এখন নতুন প্রজন্মের রক্ষণশীল নেতাদের সামনে আসার সময়।
ভ্যান্স না রুবিও?
সম্মেলনে বিবিসির সঙ্গে কথা বলা রিপাবলিকানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে দুটি নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। দুজনকেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অ্যারিজোনার রিপাবলিকান কর্মী স্যান্ডি মানি বলেন, “ট্রাম্পকে দায়িত্বের মশাল এগিয়ে দিতে হবে। আমাদের সামনে তাকাতে হবে।” তিনি ভ্যান্সকে পছন্দ করলেও রুবিও নির্বাচনে প্রার্থী হলে তাঁকেই সমর্থন করবেন বলে জানান।
ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন সময়ে ভ্যান্স ও রুবিও—দুজনেরই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন। তবে দুজনই এখন পর্যন্ত ২০২৮ সালের নির্বাচন নিয়ে সরাসরি কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি।
সম্মেলনের সময় রুবিও কূটনৈতিক সফরে ইকুয়েডরে ছিলেন। ফলে ডালাসের আয়োজনে ট্রাম্প প্রশাসনের অল্প কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়নি।
ভ্যান্স তাঁর বক্তব্যে ট্রাম্প প্রশাসনের অর্জনের প্রশংসা করেন। তাঁর দাবি, অর্থনীতি শক্তিশালী করা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং প্রেসক্রিপশন ওষুধের দাম কমানোর ক্ষেত্রে প্রশাসন সফল হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ডেমোক্র্যাট পার্টিকে আরও বামঘেঁষা হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে দলটিকে ‘পাগলের দল’ বলেও আক্রমণ করেন।
ভ্যান্স অনিশ্চিত ভোটারদেরও সরাসরি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, যারা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, তাঁদের ভোটই জিততে চান তিনি।
তবে ভ্যান্সের বক্তব্যের পরও সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে আবার মঞ্চে ফেরেন ট্রাম্প। নিজের উত্তরসূরি কে হবেন—এই প্রশ্নকে পাশে রেখে তিনি বরং নভেম্বরে ভোটারদের ভোট দিতে উৎসাহিত করেন।
সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, “আপনারা ভোট না দিলে কী হয় জানেন? নরকে যেতে হবে।”
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন