জৈব অস্ত্র তৈরিতে এআই ব্যবহারের চেষ্টা ঠেকিয়েছে অ্যানথ্রপিক
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে জৈব ও প্রচলিত অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা নেওয়ার কয়েকটি চেষ্টা শনাক্ত করে তা বন্ধ করে দিয়েছে এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের এআই মডেল ‘ক্লড’ ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
অ্যানথ্রপিকের সর্বশেষ হুমকি-বিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আট মাসে তাদের এআই বিভিন্ন ধরনের সাইবার হামলা, প্রচারণা, নজরদারি, প্রতারণা এবং অস্ত্র তৈরির কাজে অপব্যবহারের চেষ্টা শনাক্ত করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির অভিযানে এবং ইরানের একটি প্রচারমূলক প্রতিষ্ঠানও ক্লড ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া ভুয়া ডেটিং অ্যাপ তৈরি, হোটেলের ওয়াই-ফাই ব্যবহারকারীদের ফাঁদে ফেলা এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের শনাক্ত করতে নজরদারি ব্যবস্থা তৈরির মতো ঘটনাও শনাক্ত করেছে অ্যানথ্রপিক।
প্রতিষ্ঠানটি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তাদের ‘ক্লড হাইকু’, ‘সনেট’ ও ‘অপাস’ মডেলের অপব্যবহারের বিভিন্ন চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় ‘ক্লড ফেবল’ বা শক্তিশালী ‘মিথোস’ শ্রেণির মডেল ব্যবহার করা হয়নি। একটি ঘটনায় বড় মডেল ব্যবহার করে ছোট এআই মডেল প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়া ‘ডিস্টিলেশন’-এর ব্যবহার শনাক্ত করা হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে জৈব অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করতে পারে—এমনভাবে তাদের এআই ব্যবহারের পাঁচটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত বিজ্ঞানীদেরও ব্লক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিক বলছে, উন্নত এআই মডেলের সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি হলো জৈব প্রযুক্তির অপব্যবহার। যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
তবে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল বলেও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কারণ জৈব অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন একই ধরনের বৈজ্ঞানিক তথ্য আবার টিকা বা রোগের চিকিৎসা তৈরিতেও কাজে লাগতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের হুমকি-বিষয়ক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান জ্যাকব ক্লেইন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল। সাধারণত কেউ সরাসরি ‘আমি সবাইকে হত্যা করার জন্য জৈব অস্ত্র বানাতে চাই’—এমন উদ্দেশ্য নিয়ে এআই ব্যবহার করে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রচলিত অস্ত্র তৈরির সফটওয়্যার উন্নয়নেও ক্লড ব্যবহারের ছয়টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এসবের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, সশস্ত্র ড্রোন, বোমা ও অন্যান্য গোলাবারুদ তৈরির পাশাপাশি সেগুলোর লক্ষ্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির কাজও ছিল।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, সাইবার অপরাধী এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকাররা নিজেদের কর্মকাণ্ডে এআইয়ের ব্যবহার ক্রমেই বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদনে ‘শাইনিহান্টার্স’ নামের একটি হ্যাকিং গোষ্ঠী এবং চীনভিত্তিক কয়েকটি ল্যাবের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়াভিত্তিক ‘মিডনাইট ব্লিজার্ড’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা একটি হ্যাকিং গোষ্ঠীও এআই ব্যবহার করে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করেছে, যা তাদের ম্যালওয়্যার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শনাক্ত হয়েছে কি না তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুঝতে পারত। শনাক্ত হলে সেই ব্যবস্থা কোড পরিবর্তন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, এসব ঘটনা থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড আরও ভালোভাবে শনাক্ত, প্রতিরোধ ও বন্ধ করতে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও প্রযুক্তি খাতের অংশীদারদের সঙ্গেও এসব তথ্য ভাগ করা হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময়েই উন্নত এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষ নিরাপত্তা গবেষক সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এদিকে, ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোকি এআই শিল্পকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী না হওয়া পর্যন্ত উন্নত এআই তৈরির গতি স্বেচ্ছায় কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর এই সতর্কবার্তার পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির আহ্বান জানিয়ে খোলা চিঠিও দেওয়া হয়েছে। এতে নিরাপদভাবে এআই উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা বার্নি স্যান্ডার্স উন্নত এআই বা এআই সুপারইন্টেলিজেন্স নিষিদ্ধ করা এবং কিছু সময়ের জন্য উন্নত এআই উন্নয়ন স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়ে একটি বিলও উত্থাপন করেছেন।
স্যান্ডার্স বলেন, বিজ্ঞানীরা যখন মানবজাতির ওপর ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্ভাবনার কথা বলছেন, তখন এআই উন্নয়নের গতি কমানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করা বোকামি।
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন