লস এঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে কারেন বাসকে পেছনে ফেলে এগিয়ে নিথিয়া রমন
পাঁচ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হলো রিপাবলিকানদের
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে দলটি। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কিছুটা আসন হারায়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপকতা ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের প্রতি ভোটারদের বড় ধরনের অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ, ডেমোক্র্যাটদের কার্যকর নির্বাচনী প্রচার এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়াসহ কয়েকটি বিষয় রিপাবলিকানদের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে।
১. জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ভোটার
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় চাপে ছিলেন সাধারণ মানুষ। নির্বাচনী প্রচারের সময় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে ভোটারদের ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উত্তর ক্যারোলাইনার এক ভোটার নির্বাচনের আগে বিবিসিকে বলেন, ‘গ্যাসের দাম, মুদি পণ্যের দাম—সবকিছুর দাম বাড়ছে।’ এ কারণে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ছেড়ে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। জ্বালানি ও শক্তির দাম বৃদ্ধির কারণে এই চাপ আরও বেড়েছে। অক্টোবরের শুরুতে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ৫২ সেন্টের রেকর্ড দামের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে প্রায় ৭৯ শতাংশ বলেছেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতি তাঁদের পরিবারকে মাঝারি বা গুরুতর আর্থিক সংকটে ফেলেছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের বেশি প্রতি ১০ জনের মধ্যে মনে করেন, অস্বাভাবিকভাবে বেশি দামের জন্য ট্রাম্পের নীতিই দায়ী।
২. ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ
জ্বালানির দাম বাড়ার অন্যতম কারণ ছিল ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরান যুদ্ধ।
এর জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহে বড় বাধা তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অচলাবস্থার প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও। ফলে পেট্রল পাম্পে বাড়তি দাম দিতে হয়েছে দেশটির সাধারণ মানুষকে।
যুদ্ধটি অধিকাংশ আমেরিকানের কাছে জনপ্রিয় ছিল না। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে সমর্থন দেওয়া অনেক রিপাবলিকানও এটিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেছেন। প্রচারে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আর নতুন যুদ্ধে জড়াবে না।
ভোটার জরিপে ৬৩ শতাংশ বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আর ৭৪ শতাংশ ভোটারের কাছে যুদ্ধটি কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বা বড় প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচনের পরদিন ট্রাম্প স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।
৩. ডেমোক্র্যাটদের সুসংগঠিত প্রচার
ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পেছনে শক্তিশালী প্রার্থীদের পাশাপাশি ভোটারদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত প্রচারও ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত এলাকাগুলোতে তাঁদের কয়েকজন প্রার্থী ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগকে প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছিলেন তাঁরা। টেক্সাসে সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো এবং কানসাসে যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা এমনভাবে তুলে ধরেন, যা ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলে।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় সাবেক শিশু চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ অপ্রত্যাশিত জয় পান। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর ওপর তাঁর গুরুত্বারোপ এমন এক সময়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
মিশিগানে জয়ী সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল-সায়েদ প্রচারে ‘রাজনীতি থেকে অর্থ সরিয়ে মানুষের পকেটে অর্থ ফেরানো’কে অন্যতম স্লোগান করেন।
জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে প্রচারের মূল বিষয় করেন। ট্রাম্প দুইবার জিতেছেন এমন একটি অঙ্গরাজ্যে ৩৯ বছর বয়সী অসফের স্বস্তিদায়ক জয় তাঁর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও বাড়িয়েছে।
এদিকে রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজনের প্রচার ভোটারদের প্রকৃত উদ্বেগের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ না দেওয়ায় সমালোচিত হয়েছে।
৪. ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা রিপাবলিকানদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়
ভোটারদের অসন্তোষের প্রধান দুটি বিষয়—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ইরান যুদ্ধ—সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও তাঁর অনুমোদনের হার কমে যায়। ফলে ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা ঝুঁকির মুখে পড়েন।
নিজের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনতে ট্রাম্প ভোটারদের বলেন, তাঁরা যেন কল্পনা করেন, এবারের নির্বাচনে তাঁর নামও ব্যালটে রয়েছে।
তবে এক দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে থাকা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার জৌলুস কমতে শুরু করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রিপাবলিকান প্রচারে নিজেকে সামনে রাখার কৌশলটি শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপেও দেখা গিয়েছিল, অনেক আমেরিকান চান ট্রাম্প তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বাস্তব সমস্যা নিয়ে বেশি মনোযোগ দিন।
নির্বাচনের আগে সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে শেষ প্রচার সমাবেশে ট্রাম্প দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর পেছনে থাকা বিতর্কিত রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার প্রকল্প নিয়ে কথা বলেন। এতে ভোটারদের দৈনন্দিন উদ্বেগের তুলনায় ব্যক্তিগত প্রকল্প ও রাজনৈতিক বার্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হয়।
৫. ভোটারদের উদ্বেগ বুঝতে ব্যর্থতা
নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে, ভোটারদের অর্থনৈতিক চাপ, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এবং যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা কঠিন।
ডেমোক্র্যাটরা এসব বিষয়কে প্রচারের কেন্দ্রে রেখে নিজেদের প্রার্থীদের স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের প্রচারে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক বার্তা বড় জায়গা নিলেও ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যার কার্যকর সমাধান তুলে ধরার ঘাটতি ছিল।
সব মিলিয়ে এই নির্বাচন ট্রাম্পের শাসনামলের জন্য বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় তাঁর বাকি মেয়াদে আইন প্রণয়ন ও অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন