নিউইয়র্কে নির্মাণকাজে আশ্রয়চ্যুত সাত পেঁচা মিলল কাছের আরেক জলাধারে
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে, নির্বাচনে গড়ল একাধিক নতুন ইতিহাস
ছবিঃ এলএবাংলাটাইমস
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক রাতেই তৈরি হয়েছে একাধিক নতুন ইতিহাস। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের বাকি সময় কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভূমিকা পালন করবে ডেমোক্র্যাটরা। পূর্ণাঙ্গ ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দলটির একের পর এক জয় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের জন্য এসেছে বেশ কয়েকটি বড় পরাজয়ের খবর।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা ও প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিস একে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মহান প্রত্যাবর্তন শুরু হলো।’
নির্বাচনে টেক্সাস, কানসাস, ওহাইও ও সাউথ ক্যারোলাইনাসহ এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছে, যেগুলোতে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প সহজেই জয়ী হয়েছিলেন। প্রতিনিধি পরিষদে দলীয় নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারলে পরবর্তী স্পিকার হওয়ার পথেও এগিয়ে থাকবেন জেফরিস। তিনি রিপাবলিকান মাইক জনসনের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন।
নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বিরোধী দলের প্রশংসা করেছেন। বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ডেমোক্র্যাটদের ভালো প্রচারণার জন্য অভিনন্দন জানান। ফল মেনে নেওয়ার পাশাপাশি বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের পাস করা আইনে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর থাকছে।
রিপাবলিকান প্রার্থীদের পরাজয়ের জন্য ট্রাম্প কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত অবস্থানকেও দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, কোনো কোনো প্রার্থীকে ভোটাররা পছন্দ করেননি, আবার কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভালো ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং এর কারণে ভোক্তাপর্যায়ে বেড়ে যাওয়া মূল্য নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘ইরানও এর একটি অংশ ছিল।’
নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছেন মেইন অঙ্গরাজ্যের দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স। প্রায় ৩০ বছর সিনেটে দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিককে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসন। পেশায় কাঠশিল্পের সঙ্গে যুক্ত জ্যাকসন শ্রমজীবী ভোটারদের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
পরাজয় মেনে নিয়ে কলিন্স বলেন, মেইন অঙ্গরাজ্যের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সম্মান। টানা তিন দশক ধরে সিনেটে দায়িত্ব পালনের পর বিদায় নেওয়ার সময় তিনি নিজের সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের মধ্যে পুনর্নির্বাচনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা প্রার্থীদের একজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন কলিন্স। ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কৌশলও তাঁকে জয় এনে দিতে পারেনি।
নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে টেক্সাসে। প্রায় দুই প্রজন্ম ধরে অঙ্গরাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাটদের ধারাবাহিক পরাজয়ের পর এবার সিনেট ও গভর্নর—দুই গুরুত্বপূর্ণ পদেই জয় পেয়েছে দলটি। সিনেট নির্বাচনে জেমস তালারিকো এবং গভর্নর নির্বাচনে জিনা হিনোজোসার জয় ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি করে।
বিশেষ করে হিনোজোসার জয় নতুন ইতিহাস গড়েছে। তিনি টেক্সাসের প্রথম লাতিনা গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ফল প্রকাশের পর সমর্থকদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন ডেমোক্র্যাটরা।
কানসাসেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হিসাব পাল্টে দিয়েছে ডেমোক্র্যাটদের জয়। সেখানে অ্যাডাম হ্যামিলটন সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। প্রায় এক শতাব্দী পর অঙ্গরাজ্যটি থেকে আবারও একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হলেন।
জর্জিয়ায় সাবেক আটলান্টা মেয়র ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কিশা ল্যান্স বটমস গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়ে আরেকটি ইতিহাস গড়েছেন। তিনি অঙ্গরাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর এবং গভর্নর নির্বাচনে জয়ী প্রথম নারী। রিপাবলিকান প্রার্থী ও ধনকুবের ব্যবসায়ী রিক জ্যাকসনকে পরাজিত করেছেন তিনি। ২০ বছরেরও বেশি সময় পর জর্জিয়ায় আবারও একজন ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হলেন।
বটমসের জয়ের পর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। একই অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট জন অসফ দ্বিতীয় মেয়াদে জয় পেয়েছেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়তে পারে। তবে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন।
নিউ হ্যাম্পশায়ারেও সিনেট নির্বাচনে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্রিস পাপাস যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ হয়েছেন। রিপাবলিকান সাবেক সিনেটর জন সুনুনুকে পরাজিত করে জয়ী হন ৪৬ বছর বয়সী পাপাস। নির্বাচনের পর স্বামীর সঙ্গে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমর্থকদের অভিনন্দন জানান তিনি। ২০১৯ সাল থেকে প্রতিনিধি পরিষদে নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেন পাপাস। সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তিনি প্রতিনিধি পরিষদে পুনর্নির্বাচনে অংশ নেননি।
অন্যদিকে ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান প্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডস অঙ্গরাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনে ট্রাম্পের জোরালো সমর্থন পেয়েছিলেন তিনি। রিপাবলিকানদের জন্য কঠিন একটি নির্বাচনী রাতে এই জয় দলটির হাতে আসা কয়েকটি ইতিবাচক ফলের একটি।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নানা ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। ভোট গণনা ও ফল চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চললেও নির্বাচনের রাতের একের পর এক ঐতিহাসিক ঘটনা ইতিমধ্যে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন