Updates :

        বেড়াতে গিয়ে মদ পানে দুই ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু

        চীনা সেনাপ্রধানের সাথে ফোনালাপ ফাঁস, তোপের মুখে মার্কিন জেনারেল

        সাংবাদিক-কলামিস্ট গোলাপ মুনীর আর নেই

        যুক্তরাজ্যের ‘কোভিড রেড লিস্ট’ থেকে সরছে বাংলাদেশের নাম

        কাবুলে ড্রোন হামলায় নিহতরা বেসামরিক, ক্ষমা চাইলেন মার্কিন জেনারেল

        করোনায় আক্রান্ত নিউসামের দুই সন্তান!

        ব্রেকিং: কেঁপে উঠলো লস এঞ্জেলেস, ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প

        টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে বিশ্ব নেতাদের কাছে শেখ হাসিনার ৬ প্রস্তাব

        যুক্তরাজ্যের ‘রেড লিস্টমুক্ত’ বাংলাদেশ

        নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ: তদন্তে মিথ্যা বলার অভিযোগ ক্লিনটনপন্থী আইনজীবীর বিরুদ্ধে

        এক সাপের কারণে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন উত্তর ক্যারোলিনার হাজারো মানুষ!

        ইউএস-ম্যাক্সিকো সীমান্তে আবারো মানুষের ঢল, মানবতা সংকট

        ক্যালিফোর্নিয়ায় দাবানল: পুড়ে যাওয়ার শঙ্কায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাছ

        কোভিড রিলিফ জালিয়াতি: প্রতারক দম্পতির খোঁজে এফবিআই

        নিজ মেয়েকে চলন্ত ড্রাই ক্লিনার মেশিনে ঢুকিয়ে দিলেন পিতা!

        অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের পুনর্মিলনের নতুন আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে

        ই-কমার্সে প্রতারিতদের পাওনা সরকারকে দেওয়ার দাবি সংসদে

        ইভ্যালির সিইও রাসেল ও তার স্ত্রী আটক

        উইসকনসিনে চার বন্ধুকে গুলি করে হত্যা, লাশ মিললো ভ্যানে

        হ্যারিকেন আইডার বন্যায় নিখোঁজ বৃদ্ধের দেহ মিললো কুমিরের পেটে

ঢাকার বাসযোগ্যতা ও আমাদের করণীয়

ঢাকার বাসযোগ্যতা ও আমাদের করণীয়

প্রতি দুই বছর অন্তর দ্য ইকোনমিপ ইন্টেলিজেন্স প্রণীত 'সেফ সিটি ইনডেপ' প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ এ বছর আগস্টে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ঢাকার অবস্থান তালিকার একদম তলানির দিকে। কোনো শহরের অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পরিবেশগত সুরক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা- এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মোট ৭৬টি নিয়ামকের পরিপ্রেক্ষিতে এই তালিকার ক্রমবিন্যাস করা হয়েছে। তালিকার পরিবেশ সুরক্ষার দিক বিবেচনায় ঢাকার অবস্থান ৪৭তম। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই অবস্থান যথাক্রমে ৫২, ৫৪, ৫৫ এবং ৫৬ ক্রমতে।

২০২১ সালে সর্বশেষ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ৬০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান ৪৮.৯ পয়েন্ট নিয়ে ৫৪তম। ২০১৯ সালের রিপোর্টে ঢাকার অবস্থান ছিল ৪৪.৬ পয়েন্ট নিয়ে ৫৬তম এবং ২০১৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী এর অবস্থান ছিল ৪৭.৪ পয়েন্ট নিয়ে ৫৮তম। ২০১৫ সালে প্রথম প্রকাশিত এই রিপোর্টে ঢাকা স্থান পায়নি। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার অবস্থানের সামান্য উন্নতি হলেও কার্যত ঢাকা বসবাসের উপযুক্ততার তালিকায় যে অবস্থানে রয়েছে তা রীতিমতো লজ্জাজনক। এ বছর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বসবাসযোগ্যতার ভিত্তিতে শীর্ষ পাঁচ শহর হলো- ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, কানাডার টরন্টো, সিঙ্গাপুর সিটি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি এবং জাপানের টোকিও। এ ছাড়া আমস্টার্ডাম, ওয়েলিংটন, হংকং, মেলবোর্ন এবং স্টকহোম রয়েছে তালিকার শীর্ষ দশে।

ঢাকার এই পিছিয়ে থাকার কারণ অনুসন্ধানে নামলে প্রথমেই যে বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয় তা হলো অপরিকল্পনা ও অধিক জনসংখ্যা। গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে যখন ঢাকার প্রথম আধুনিকায়ন হয়, তখন এই শহরটির জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ লাখের মতো। ১৯৭০ সালে তা বেড়ে ১৮ লাখ হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, এই সংখ্যা ১৯৮০ সালে ৪০ লাখ, ১৯৯১ সালে ৬৮ লাখ, ২০০১ সালে ৮১ লাখ এবং ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী এক কোটি ৩০ লাখ। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের তথ্যমতে, বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ। অন্যদিকে, ঢাকা শহরের আয়তন মাত্র ৩০৬ বর্গকিলোমিটার। অর্থনৈতিকভাবে ১৬২ বিলিয়ন জিডিপির শহর ঢাকা আয়তনে গত ৫০ বছরে গাণিতিক হারে বিস্তৃতি লাভ করলেও এখানে জনসংখ্যা বেড়েছে রীতিমতো জ্যামিতিক হারে। ফলে একটি ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। এখানেই আমাদের পরিকল্পনাহীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রশাসনিক, বিচার ব্যবস্থা এবং শিল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে ঢাকা। সারাদেশ থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুও ঢাকা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ঢাকায় আসছে। অন্যদিকে, ঢাকা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় বয়স্ক মানুষকেও ঢাকায় আসতে হচ্ছে। ঢাকার মতো এ রকম জনসংখ্যার ঢল যদি এই তালিকার শীর্ষস্থানীয় কোনো শহরকে মোকাবিলা করতে হতো, সে ক্ষেত্রে সেই পরিবেশের ভারসাম্যের শহরেরও হয়তো একই অবস্থা হতো।

ঢাকার স্বাস্থ্যসেবা যে খুব উন্নত তা নয়। বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে যেমন জরুরি ক্ষেত্রে ৫-১০ মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়া যায় কিংবা হাসপাতালে পৌঁছানো যায় তা ঢাকায় অবাস্তব। জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও এখানে কার্যত ক্ষমতাবান কিংবা ধনীদের জন্যই বরাদ্দ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বেহাল দশা। জনস্বাস্থ্যে আমাদের বিনিয়োগও সীমিত।

ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা নাজুক। আধুনিক বিশ্বে একটি মেগাসিটিতে ট্রাফিক ব্যবস্থা অকার্যকর হতে পারে তা ঢাকাকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের এ শহরে সময় মাফিক বাস, ট্রেন বা জলযান চলে না। গত এক দশকে ঢাকার ট্যাপি সার্ভিস কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও ঢাকায় নিরাপদ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম গড়ে তোলা যায়নি। পৃথিবীর উন্নত শহরগুলোতে প্রতিদিন সকালে উপশহর বা অন্য জেলা থেকে শহরমুখী অসংখ্য ট্রেন ও বাস সার্ভিস দেখা যায়। আবার সন্ধ্যায় শহর থেকে উপশহরমুখী পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চলতে দেখা যায়। ফলে কর্মক্ষম মানুষ দিনের বেলায় শহরে প্রবেশ করে কাজ শেষে সন্ধ্যায় নিজ গন্তব্যে ফিরে যায়। ঢাকার ট্রেন ও বাসের সময়সূচি ঠিক এর উল্টো। ফলে ঢাকায় কর্মরত মানুষকে ঢাকাতেই বাস করতে হয়। ঢাকায় জরুরি বাহনগুলোও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলতে পারে না। কখনও দেখা যায় দীর্ঘ সময় অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি যানজটে আটকে থাকে। বস্তুত ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিক নগর পরিকল্পনানীতির ঠিক বিপরীত।

পৃথিবীর সব উন্নত শহরে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রক্ষেপিত ভবিষ্যৎ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ঢাকায় রাজউক নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই দায়িত্বে থাকলেও সেখানে দুর্নীতি ও আইন ভাঙার প্রতিযোগিতা চলে। ফলে এই শহরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও তা বাস্তবে অপরিকল্পিত। তাছাড়া সরকারি সংস্থাগুলোর মাঝে সমন্বয় না থাকায় সারা বছর শহরজুড়ে ভাঙাগড়ার খেলা চলে!

ব্যক্তিগত ও ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রশ্নেও ঢাকা বেশ পিছিয়ে। রাস্তাঘাটে রাতে তো বটেই, দিনেও কেউই নিরাপদ বোধ করে না। নিত্য এখানে ছিনতাই, পকেটমারের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। সাম্প্রতিক ৯৯৯ জরুরি সেবা চালু হলেও এখানে পুলিশের সেবার মান প্রশ্নাতীত নয়। তাছাড়া নারীর জন্য ঢাকা একটি চূড়ান্ত অনিরাপদ শহর। এই শহরে নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা পাবলিক টয়লেট সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। পথে-ঘাটে যৌন হয়রানি, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে হেনস্তা হওয়া কিংবা কর্মজীবী সিঙ্গেল নারীদের জন্য আবাস খুঁজে না পাওয়া ঢাকায় একটি সাধারণ ঘটনা।

ঢাকা কেন এই তালিকার শেষের দিকে অবস্থান নিয়েছে তার তাত্ত্বিক বিশ্নেষণ করতে গেলে উপর্যুক্ত প্রতিবেদনের একটি অংশ প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে। সেখানে বলা হয়েছে, 'আয় বৃদ্ধি বিনিয়োগ বাড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে প্রত্যেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে তার ওপর। স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান। একটি শহরকে নিরাপদ করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ একটি সরকার থাকা গুরুত্বপূর্ণ।'

আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্নেষণ করলে দেখতে পাই, এখানে নিশ্চিতভাবেই স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার অভাব রয়েছে। দুর্নীতি, আইনের শাসনের অভাব কিংবা জনগণের প্রতি ক্ষমতাশীলদের দায়বদ্ধতা না থাকা মূলত আমাদের উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে দেয়।

ঢাকাকে বসবাস উপযুক্ত করে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা তথা ড্যাপের বাস্তবায়ন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কাজে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ। আমরা আশা করি, সংশ্নিষ্ট মহলের সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা ঢাকাকে একবিংশ শতকের স্ট্যান্ডার্ড মেনে বসবাসযোগ্য শহরে পরিণত করতে সক্ষম হবো।

লেখক: প্রবাসী শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন

পাঠকের মতামত