মেডিকেইড জালিয়াতির অভিযোগের মুখে বিষয় ঘোরাতে চাইছে ক্যালিফোর্নিয়া
ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে গেলে কী ঘটবে?
এলএ বাংলা টাইমস
ক্যালিফোর্নিয়া, ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে পর্যটন কিংবা প্রযুক্তি ইত্যাদি নানা কারণেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক দিক থেকেও যেন এর গুরুত্বের কোন শেষ নেই। ক্যালিফোর্নিয়া অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাবে- এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে ফেডারেল রাষ্ট্র যে সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকবে কিংবা তাদের কোনো ভাঙন হবে না। এমন চিন্তাও করা যায় না। কয়েক বছর আগেই ক্যালিফোর্নিয়া ভেঙে আরেকটি রাজ্য গঠনের দাবি উঠেছিল। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার বের হওয়ার দাবি যে উঠবে না। তেমন আশা করা ভুল নয়। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার সিংহভাগ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে। কিন্তু পারস্পরিক শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে এই দাবি এখনো জোরালো হচ্ছে না। যদিও বিগত বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে নিজেদের আদর্শের প্রতি যে আকর্ষণ বেড়েছে, তা খুবই চিন্তার বিষয়। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের বাড়বাড়ন্তের কথাই বিবেচনা করুন।
সেই হিসেবে যদি ক্যালিফোর্নিয়ার নাগরিকরাও নিজেদের একক রাষ্ট্র গঠনের কথা ভাবেন তাহলে পরিস্থিতি কেমন হতে পারে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
গৃহযুদ্ধ?
আজ থেকে ১৫৮ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের ১১টি রাজ্য যখন ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করেছিল, তখন তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ১৮৬১-১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চার বছরের গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারান মোট ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ। এছাড়া নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল রাষ্ট্রের ভিত। এখন ক্যালিফোর্নিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তা শান্তিপূর্ণভাবে হবে সেটা বলা যায় না। তবে গৃহযুদ্ধের বিভীষিকা আরো একবার ফিরে আসুক- তা কোনো আমেরিকান চাইবেন না।
এদিকে ফেডারেল রাষ্ট্রে একক কোনো রাজ্যের বের হয়ে যাওয়াও ভালোভাবে দেখা হয় না, যার প্রমাণ স্বয়ং আমরা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তান থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন গণহত্যা, ধর্ষণসহ এমন কোনো নির্যাতন ছিল না- যা করা হয়নি। আবার ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতা পেতে টানা ৩০ বছর লড়াই করতে হয়েছে। তবে স্বাধীনতার ইতিহাস যে সবসময় রক্তাক্ত হয়, তেমনও নয়! ১৯৯৩ সালে বিনা রক্তপাতে স্লোভাকিয়া থেকে স্বাধীনতা লাভ করে চেক প্রজাতন্ত্র।
ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, সেটি নির্ভর করছে কে অথবা কোন দল দেশের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে তার ওপর। এ সম্পর্কে কানাডার অটোয়ার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক স্টিফেন সেইডমেন বলেন, রিপাবলিকানরা হয়তো একে ভালো সিদ্ধান্ত বলতে পারে। বিপরীতে ডেমোক্রেটরা বলবে, আমরা যেকোনো মূল্যে ক্যালিফোর্নিয়াকে ধরে রাখবো অথবা একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেবো।
ক্যালিফোর্নিয়ার অন্য রাজ্যের সাথে বর্তমানে যে বিরোধ নেই- তা বলা যায় না। বিশেষ করে অর্থনীতিতে অবদানের জন্য এ রাজ্যের মানুষ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছেদ চান। কিন্তু তারা যদি সত্যিকার অর্থে বের হয়ে যেতে চান, তাহলে তাদের প্রতিরোধ করা সহজ হবে না। কারণ ক্যালিফোর্নিয়ানরা ইরাকের কুর্দি কিংবা স্পেনের কাতালান নন। চাইলেই পেন্টাগন জেনারেল পাঠাবে আর তারা ক্যালিফোর্নিয়া দখল করবে- এমন চিন্তা একবিংশ শতকে অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে করা যায় না। সেদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক অনুশীলনের গরিমা থেকেই ব্যাপারটি দুষ্কর।
ডেমোক্রেটদের মহাপতন
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ ৫৫টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়াতে। এই ভোট যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমেরিকার রাজনীতিতে এই রাজ্যের গুরুত্ব সর্বাধিক। কিন্তু এখানে বরাবরের মতোই ডেমোক্রেটদের আধিপত্য। '৯০ এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের জয়ের পেছনে বড় অবদান রেখে যাচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যদি সেই ক্যালিফোর্নিয়ারই শান্তিপূর্ণ বিচ্ছেদ হয়, তাহলে রাজনীতিতে ডেমোক্রেটদের ভবিষ্যত অন্ধকার। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ তখন পুরোপুরি রিপাবলিকানের হাতে চলে যাবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের জয়ের সম্ভাবনাই হয়ে যাবে ক্ষীণ। কেননা ক্যালিফোর্নিয়ার বাইরে যে সকল ডেমোক্রেট প্রতিনিধি থাকবেন, তারাও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা ভেবে দল পরিবর্তন করতে পারেন।
অর্থনীতিতে ধ্বস
ক্যালিফোর্নিয়ার বিচ্ছেদ যদি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে অর্থনীতিতে যে ধ্বস সৃষ্টি করবে- সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে ইতোমধ্যে একবার আলোচনা করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া যদি বের হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির যে পতন ঘটবে, তা বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যে কথায় কথায় ইরান কিংবা অন্য শত্রু রাষ্ট্রের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রদান করছে, তা আর সম্ভব হবে না। বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের যে দাপট, সেটিও মিইয়ে যাবে। ডলারের স্থান দখল করবে ইউরো অথবা চীনের ইউয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামরিক জোটে তাদের প্রভাব কমে যাবে। বরং তাদের অন্যান্য মিত্রের ওপর নির্ভর করতে হবে। বিপরীতে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন তুরুপের তাস হবে ক্যালিফোর্নিয়া। তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিভিন্ন দেশ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের সাথে জোট গঠনে এগিয়ে আসবে।
অভিবাসন স্বর্গ
রাষ্ট্র হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার আত্মপ্রকাশ হলে সেখানে অভিবাসী-প্রত্যাশী মানুষের লাইন হবে লম্বা। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে দেশটিও সেখানকার সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি খাত ও মহাকাশ কোম্পানিতে নতুন উদ্ভাবকদের আমন্ত্রণ জানাবে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিনিয়োগকারীদের সেখানে অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ অর্থনীতি হওয়ার কারণে সেখানকার অন্যান্য রাজ্য থেকেও অনেক মানুষ ক্যালিফোর্নিয়াতে ভীড় করবে। তবে অভিবাসন হবে ভৌগোলিকভাবে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসীদের স্বাগত জানানো হলেও উত্তরে তাদের বাধার মুখে পড়তে হবে। অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগই অভিবাসীদের ক্যালিফোর্নিয়ামুখী করবে।
ক্যালিফোর্নিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যায় তাহলে অন্যান্য রাজ্যেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে যেসব রাজ্যে ডেমোক্রেটদের প্রভাব রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির জয়ের সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় তারা চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে নিজেরা রাষ্ট্র গঠনের।
বর্তমানে অনেক রাজ্যের নতুন রাষ্ট্র গঠনের জন্য অর্থনীতি ও জনশক্তি রয়েছে। ফ্লোরিডা ও টেক্সাস চাইলে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে। সে হিসেবে বলা যায়, ক্যালিফোর্নিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যায় তাহলে মার্কিন ফেডারেলের পতন ঘটবে। ঠিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো!
এলএ বাংলা টাইমস/এম/বিএইচ
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার করুন